
জাতীয় পতাকাবাহী রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তা পদায়ন ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ার নীতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে তীব্র জলঘোলা শুরু হয়েছে। ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের ব্যবস্থাপক শাহনাজ বেগমকে উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় সেই বহুল আলোচিত নিয়োগ আদেশটি তড়িঘড়ি করে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এই নাটকীয় পরিবর্তনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি বিমানের এক দাপ্তরিক আদেশে শাহনাজ বেগমকে ডিজিএম পদের অতিরিক্ত দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। কিন্তু এই খবরটি জানাজানি হওয়ার পর পরই বিমানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরের নানা মহলে তীব্র সমালোচনা ও তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে পড়ে একই দিনেই তার সেই নতুন দায়িত্বের আদেশটি প্রত্যাহার করে নেয় বিমান প্রশাসন। আকস্মিক এই ঘটনাটি বিমানের মতো সংবেদনশীল সংস্থায় উচ্চপদে কর্মকর্তা নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন চিহ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিমানের ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, শাহনাজ বেগমকে ঘিরে অতীতেও বিভিন্ন গুরুতর অনিয়মের বিতর্ক ছিল। তাদের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর চাকরি করার পর অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে নিজের জন্মতারিখ সংশোধন করে চাকরির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে নেন তিনি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বিমানে আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা সত্যতা প্রকাশ করা হয়নি।
কর্মীদের একাংশ আরও অভিযোগ করেছেন, শিডিউলিং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় শাহনাজ বেগম ফ্লাইট ডিউটি বণ্টনের ক্ষেত্রে চরম স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন। এর ফলে অনেক যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যা নিয়ে বিমানের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল।
এখানেই শেষ নয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানের বিশেষ ভিআইপি ফ্লাইটের ক্রু নির্বাচন নিয়েও তিনি বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকজন ক্রুকে সেই স্পর্শকাতর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে যে, ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট একটি সহিংসতা ও হত্যা মামলায় শাহনাজ বেগমের নাম সরাসরি আসামি হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। এমন একজন মামলার আসামিকে বিমানের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এত গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো, তা নিয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর ও নানামুখী অভিযোগের বিষয়ে শাহনাজ বেগমের ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এই পুরো বিতর্কিত নিয়োগ ও প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র ও মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বুসরা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, "ম্যানেজার শাহনাজ বেগমকে ডিজিএম পদে স্থায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে না করলে সেই দায়িত্ব প্রত্যাহার করতেই পারে।"