
বৃহৎ অভিবাসন সংস্কারের অংশ হিসেবে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের মতো ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে শীর্ষ গবেষকদের স্পনসর করার অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। এর ফলে যোগ্য গবেষকদের জন্য মাত্র তিন বছরের মধ্যেই স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন-আইএলআর) পাওয়ার পথ আরও সহজ হয়ে গেল।
যুক্তরাজ্যের দক্ষ অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে সরকার গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার ‘এন্ডোর্সড ফান্ডার’ পথটি ১০০টির বেশি গবেষণাভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করেছে। ৬ আগস্ট ঘোষিত এই সংস্কার স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা ব্যবস্থার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসায় যেখানে স্থায়ী বসবাসের জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয় এবং ভিসাধারী নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আবদ্ধ থাকেন, সেখানে গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার আওতায় এন্ডোর্সমেন্ট পাওয়া গবেষকরা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, পরামর্শক হিসেবে কাজ করা কিংবা নিজস্ব স্পিন-আউট কোম্পানি গঠনের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
সরকারের প্রস্তাবিত ‘আর্ন্ড সেটেলমেন্ট’ সংস্কারে অধিকাংশ ভিসার ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য সময়সীমা ১০ বছর করার পরিকল্পনা থাকলেও গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসাধারীরা আগের মতোই তিন বছরের দ্রুততর সুযোগ পাবেন। এছাড়া, আবেদন করার সময় গ্লোবাল ট্যালেন্ট স্ট্যাটাস থাকলে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসায় কাটানো সময়ও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ১২ মাসে ১৮০ দিনের বেশি যুক্তরাজ্যের বাইরে থাকা যাবে না। তবে ইউকেআরআই বা দ্য রয়্যাল সোসাইটির এন্ডোর্সমেন্ট পাওয়া গবেষকদের ক্ষেত্রে গবেষণার কাজে বিদেশে অবস্থানের সময় এই সীমার মধ্যে গণনা করা হবে না।
অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত হলো আরও শতাধিক প্রতিষ্ঠান
নতুন এই সম্প্রসারণের ফলে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯১টিতে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এনএইচএস ট্রাস্ট, জাতীয় জাদুঘর, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ১০টি ভিন্ন খাতের সংস্থা।
নতুন অনুমোদন পাওয়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার, অ্যাডেড ভ্যালু সলিউশনস, ডেনরয় প্লাস্টিকস, ফিল্ম সিমরু, রিভারলেন এবং ইনফিটোপস। জীবন বিজ্ঞান ও বায়োটেক খাতে রয়েছে জিএসকে, ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইব, ইমিউনোকোর, জিনোমিকস ইংল্যান্ড এবং ওয়েলকাম ট্রাস্ট স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউট। ডিপ টেক ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তি খাতে অনুমোদন পেয়েছে রিভারলেন, নু কোয়ান্টাম, কোয়ান্টিনাম, অক্সফোর্ড কোয়ান্টাম সার্কিটস, আইবিএম ও আর্ম।
এ ছাড়া অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে জিকেএন অ্যারোস্পেস, লিওনার্দো ইউকে ও ম্যাকলারেন প্লাস্টিকস এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ইউকে অ্যাটমিক এনার্জি অথরিটি, দ্য ফ্যারাডে ইনস্টিটিউশন ও ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান আধুনিক শিল্প কৌশলের আটটি উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন খাতের প্রতিনিধিত্ব করছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত উৎপাদন, ডিজিটাল ও প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জীবন বিজ্ঞান এবং সৃজনশীল শিল্প।
একই সঙ্গে সরকার ফিউচার টেকনোলজি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন স্কিম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ইঞ্জিনিয়ারিং বায়োলজির মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো দুই বছরের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষকদের নিয়োগের সুযোগ পাবে।
এ পর্যন্ত ৫৪ মিলিয়ন পাউন্ডের গ্লোবাল ট্যালেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে ১৮ জন শীর্ষ গবেষককে যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে কাজ করছে গ্লোবাল ট্যালেন্ট টাস্কফোর্স।
বাণিজ্য সচিব জোনাথন রেনল্ডস সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যেই বিশ্বের সেরা মেধাবীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। এসব গবেষকের উদ্ভাবন মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। তিনি বলেন, গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার আওতা ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষক নিয়োগ আরও সহজ করা হয়েছে।
ইউকেআরআই-এর ইন্টারন্যাশনাল, ট্যালেন্ট অ্যান্ড স্কিলস চ্যাম্পিয়ন অধ্যাপক ক্রিস্টোফার স্মিথ বলেন, এই সম্প্রসারণের সুফল দেশের আরও বিস্তৃত অঞ্চলে পৌঁছাবে এবং ওষুধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক অর্থনীতির বিভিন্ন খাত উপকৃত হবে।
ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের অলিভার বাকলি-মেলর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আরও বেশি বৈশ্বিক প্রতিভাকে যুক্তরাজ্যে আনার সুযোগ সৃষ্টি করতে এ ধরনের পদক্ষেপ আরও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ইউকেকোয়ান্টামের জোনাথন লেগ-স্মিথের মতে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে যুক্তরাজ্যের অগ্রগতি ধরে রাখতে বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিভারলেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ব্রিয়ারলি সাংবাদিকদের বলেন, গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসা বিশ্বের সেরা গবেষকদের দ্রুত ও নমনীয় উপায়ে যুক্তরাজ্যে আনার সুযোগ তৈরি করেছে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে এমন গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দীন সুমন বলেন, ইতোমধ্যে ১৩০টির বেশি দেশের ১২ হাজার ৫০০ জন প্রতিভাবান ব্যক্তি এন্ডোর্সড ফান্ডার পথের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, নতুন এই সম্প্রসারণ বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিভা আকর্ষণে যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, যারা যুক্তরাজ্যে গবেষণাভিত্তিক পেশাজীবন গড়ার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—নতুন অনুমোদিত বাণিজ্যিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্যারিয়ার সামঞ্জস্য করতে পারলে স্থায়ী বসবাসের পথ এখন আগের তুলনায় আরও সহজ।