
কুমিল্লায় বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে মারধরের শিকার হয়ে অটোরিকশাচালক মো. শরিফুল ইসলাম (৩৮) মারা যাওয়ার ঘটনায় শোক ও ক্ষোভে ভেঙে পড়েছে তার পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) গভীর রাতে কুমিল্লা সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বুধবার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত শরিফুল ইসলামের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার উত্তর চেরাংগা গ্রামে। প্রায় আট মাস আগে জীবিকার সন্ধানে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কুমিল্লায় আসেন তিনি। নগরের মঠপুষ্করনী এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন।
স্বজনদের অভিযোগ, আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার বিশ্বকাপ ম্যাচ চলাকালে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে খেলা দেখতে গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে শরিফুলের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বুধবার কুমিল্লায় ভাড়া বাসায় আহাজারি করতে করতে শরিফুলের স্ত্রী বিউটি বানু বলেন, ‘খেলা নিয়া মানুষটারে এইভাবে মাইরা ফালাইবো, এইটা কেমন কথা? আমার দুইডা মাইয়া ছাওয়াল। এহন কারে বাবা কইয়া ডাকবো? আমার দুইডা মাইয়া এতিম হইয়া গেল। যারা আমার স্বামীরে খুন করছে, মুই তাদের কঠিন বিচার চাই। মুই গরিব-অসহায় মানুষ, এহন এই দুইডা মাইয়ারে কেমনে মানুষ করমু? হামার গোটা পরিবারডাই শেষ হইয়া গেল।’
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শরিফুলের দুই মেয়ে আগে নীলফামারীতে পড়াশোনা করলেও তাদের কুমিল্লার একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে নীলফামারী থেকে কুমিল্লায় ছুটে আসেন শরিফুলের শ্বশুর মতিউর রহমান, শাশুড়ি নুর বানু ও অন্যান্য স্বজন। মতিউর রহমান বলেন, খেলা নিয়ে তর্কের জেরে একজন মানুষকে প্রাণ দিতে হবে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেন।
ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী, যিনি শরিফুলকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন, জানান, ম্যাচ চলাকালে এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাক্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে কয়েকজন মিলে শরিফুলকে মারধর করে। সেখান থেকে সরে যাওয়ার পরও তাকে অনুসরণ করে আবারও মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটনার পর থেকে সংশ্লিষ্ট চায়ের দোকান বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে যাদের নাম এসেছে, তারা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, খেলা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার পর শরিফুলকে মারধর করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।