
রাজধানীর উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাব এখন অননুমোদিত দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং দখলদারদের পাল্টাপাল্টি আহ্বায়ক কমিটি, সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন এবং ৭ জানুয়ারি ২০২৫ ক্লাব প্রাঙ্গণের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিরোধ।
ক্লাবের পুরোনো সদস্যদের একাংশের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাকালীন অরাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে ছিল সংগঠনটি। দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের কবলে থাকার পর সর্বশেষ ৭ জানুয়ারি ২০২৫ মনোয়ারুল ইসলাম তিতাস ও রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন একটি গোষ্ঠী ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা =এটিকে বেআইনি ও অননুমোদিত দখল হিসেবে অভিযোগ করেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরে জমা দেওয়া নথি, ক্লাবের সদস্য ও কমিটি-সংক্রান্ত রেকর্ড এবং পুরোনো সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় বর্তমান বিরোধের পেছনে দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত টানাপোড়েনের তথ্য পাওয়া যায়।
১৯৮৬ সালে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাব ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ও নিবন্ধিত হয়। ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য গড়ে ওঠা সংগঠনটির সঙ্গে ফুটবল, ক্রিকেট, টেবিল টেনিস ও হ্যান্ডবলের মতো বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রম যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ক্লাবের জন্য জমি বরাদ্দ এবং স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা হয়।
ক্লাবের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অননুমোদিত নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেক পুরোনো সদস্য ক্লাবের নিয়মিত কার্যক্রম থেকে দূরে সরে যান।
ক্লাব প্রাঙ্গণে ১৯৯৯ সালের হত্যা
উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাবের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর অধ্যায়গুলোর একটি ১৯৯৯ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক মোমিনুর রহমান শিমুলের হত্যা। ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত ‘A mother's long wait for justice’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৯ সালের ৩০ অক্টোবর ক্লাব প্রাঙ্গণে শিমুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

শিমুলের পরিবারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় এলাকায় চাঁদাবাজি ও অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি হত্যার শিকার হন বলে পরিবার ও ক্লাবের সদস্যদের ধারণা ছিল।
হত্যার চার বছর পরও পরিবারের পক্ষ থেকে সব আসামিকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল।
৫ আগস্টের পর পুরোনো সদস্যদের উদ্যোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে ক্লাবকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন পুরোনো সদস্যদের একটি অংশ। তাদের লক্ষ্য ছিল ক্লাবকে আবার প্রতিষ্ঠাকালীন অরাজনৈতিক চরিত্রে ফিরিয়ে আনা। এই উদ্যোগে ড. এ. এম. এম. শহীদুজ্জামান কোরেশী ও শেখ ফখরুদ্দিন চৌধুরী তৈমুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে ড. কোরেশী ও তৈমুরকে যৌথ আহ্বায়ক করে একটি আহ্বায়ক কমিটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়।
এক মাসের ব্যবধানে পাল্টা কমিটি
অক্টোবরের শেষ দিকে একটি আহ্বায়ক কমিটি জমা দেওয়ার পর নভেম্বরের শুরুতে মেজর (অব.) সাব্বির হাসানের পক্ষ থেকে আরেকটি আহ্বায়ক কমিটি জমা দেওয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে ক্লাব পরিচালনা নিয়ে বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পাল্টা কমিটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সদস্যপদ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি নথিতে মেজর (অব.) সাব্বিরসহ আনুমানিক ২৫ জন স্বাক্ষরকারী নিজেদের ‘কতিপয় উত্তরাবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে। সেখানে তাদেরকে উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাবের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। প্রতিষ্ঠাতা পক্ষ বলছেন, শুধু উত্তরার বাসিন্দা হওয়া কোনো নিবন্ধিত সংগঠনের সদস্যপদ বা ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের অধিকার দেয় না।
৭ জানুয়ারি ক্লাব দখলের অভিযোগ
ক্লাব নিয়ে বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি। জানা গেছে, ওই দিন মেজর (অব.) সাব্বির হাসান, মনোয়ারুল ইসলাম তিতাস ও রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন একটি গোষ্ঠী ক্লাব প্রাঙ্গণের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
ক্লাবের অনেক সদস্য ঘটনাটিকে বেআইনি ও অননুমোদিত দখল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এছাড়াও জানুয়ারি মাসে সমাজসেবা অধিদপ্তরে জমা দেওয়া একটি নথিতে ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতি, ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকা, সিসিটিভি নিয়ে হস্তক্ষেপ এবং সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়।

ওই আবেদনে ক্লাবের আইনসঙ্গত ব্যবস্থাপনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ
ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিএনপির নাম ব্যবহার করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি দলীয়ভাবে কাউকে কোনো ক্লাব দখলের অনুমতি দেয়নি। বরং তারা বিষয়টি বিস্তারিত খতিয়ে দেখবে বলে জানিয়েছে।
ক্লাবে যেতে ভয় পাচ্ছেন পুরোনো সদস্যরা
৭ জানুয়ারির ঘটনার পর সম্ভাব্য সংঘর্ষ বা সহিংসতার আশঙ্কায় অনেক পুরোনো সদস্য ক্লাব প্রাঙ্গণে যাওয়া বন্ধ করেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরে দেওয়া একটি নথিতেও সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্লাব প্রাঙ্গণে বৈঠক না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সমাধান চান ফ্রেন্ডস ক্লাবের সদস্যরা
উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাব পরিচালনার আইনসঙ্গত অধিকার কার? এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করতে হবে ক্লাবের মূল নিবন্ধন, গঠনতন্ত্র, স্বীকৃত সদস্যপদ, নিয়মমাফিক সভা এবং কমিটি-সংক্রান্ত নথির ভিত্তিতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অক্টোবরের শেষ দিকে জমা দেওয়া আহ্বায়ক কমিটি, নভেম্বরের শুরুতে জমা দেওয়া পাল্টা কমিটি এবং ৭ জানুয়ারি ২০২৫ ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাপ্রবাহও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজসেবা অধিদপ্তর এসব নথি যাচাই করে কোন পক্ষের সদস্যপদ বৈধ, কোন কমিটির সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে এবং ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বৈধ কর্তৃত্ব কার ছিল—তা নির্ধারণ করতে পারে।
পুরোনো সদস্যদের দাবি, কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়—গঠনতন্ত্র ও সদস্যদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই ক্লাব পরিচালিত হওয়া উচিত। ১৯৮৬ সালে যে অরাজনৈতিক ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ক্লাবকে সেই চরিত্রে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত দখলদারদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।