
দেশের ব্যাংকিং খাতে অর্থের সংকট না থাকলেও বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের স্থবিরতা। ব্যাংকগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য জমেছে, যা ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে তলানিতে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে ব্যাংকে বিপুল অর্থ পড়ে থাকলেও তা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে কাজে লাগছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিনিয়োগ বাড়াতে ও ঋণের গতি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের সুদের সীমাও কমানো হয়েছে।
তবে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে এ সিদ্ধান্তের প্রভাব ঋণের সুদহারে তেমন পড়েনি। ফলে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব নীতিগত ছাড়ের পরও দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ বাড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটটি শুধু ঋণের সহজলভ্যতা বা সুদের হারের নয়; মূল সমস্যা ব্যবসায়িক আস্থা, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করলেও সামগ্রিক ঋণের সুদের হার খুব বেশি কমবে বলে মনে হয় না। তাই শুধু নীতি সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হলে অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় পণ্যের চাহিদা তৈরি করতে হবে। চাহিদা না থাকলে ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত তহবিল থাকলেও ঋণ বিতরণ বাড়ানো সম্ভব হবে না।
এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের সার্বিক পরিবেশ উন্নত করা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক বাধা দূর করা এবং পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তারল্যের রেকর্ড, ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মে মাসে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত অর্থ বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ফলে শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতে অর্থের প্রবাহ না বেড়ে বিপুল তারল্য ব্যাংকেই পড়ে থাকছে।
‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ ও সরকারি সিকিউরিটিজ
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতের জন্য সম্ভাব্য অর্থের বড় একটি অংশ এখন সরকারি খাতে চলে যাচ্ছে।
ফলে উৎপাদনশীল খাতে মূলধনপ্রবাহ ব্যাহত হলেও ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
শিল্প খাতে সংকট, উদ্যোক্তাদের অনীহা
বিনিয়োগে মন্দার পেছনে জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত ব্যবসায়িক ব্যয় এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। বর্তমান পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনের ঋণই নিচ্ছেন তারা।
ডলার ক্রয় ও আমানত বৃদ্ধিতে বাড়ছে তারল্য
উদ্বৃত্ত তারল্য বৃদ্ধির পেছনে শুধু আমানত বৃদ্ধি নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে ডলার কেনার সিদ্ধান্তও বড় ভূমিকা রেখেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। ডলার কেনার বিপরীতে সমপরিমাণ টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করায় তারল্যের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
এ ছাড়া আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও ঋণ বিতরণ না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমেছে।
খেলাপি ঋণের চাপ, সতর্ক ব্যাংক
অতীতে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিতরণ করা ঋণের কারণে খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন ঋণ বিতরণে অত্যন্ত সতর্ক।
নতুন ঋণের আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জামানত, ব্যবসার সক্ষমতা এবং নগদ প্রবাহ কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে অনেক ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত তহবিল থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ খাতে অর্থ বিনিয়োগ করছে।
কলমানি ও রেপো বাজারেও স্থবিরতা
ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকায় আন্তব্যাংক বাজার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমে গেছে।
কলমানি, আন্তব্যাংক রেপো ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মোট ধার জুনে প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে জুলাইয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক মাসে ধার কমেছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে জুলাইয়ে কলমানি বাজারের টার্নওভার কমেছে ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং আন্তব্যাংক রেপোর টার্নওভার কমেছে ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ।
নীতিগত উদ্যোগেও কাটছে না আস্থার সংকট
বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বড় গ্রাহকের ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে এবং ঋণের স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নীতিগত ছাড় বা সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
অন্যথায় ব্যাংকিং খাতে জমে থাকা বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজে লাগানো কঠিন হবে।