
সারা দেশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইককে নিয়মের আওতায় আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট রুটের বাইরে এসব যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। একই সঙ্গে একটি নিবন্ধন ব্যবহার করে একাধিক যান চালানোর অনিয়ম ঠেকাতে চালু করা হবে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর (QR) কোডভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা।
নতুন নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে মানুষের জীবিকা, সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশ—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে উত্থাপিত একটি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা নিয়ে সংসদে উদ্বেগ
এর আগে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের বিষয়টি নিয়ে ওই নোটিশ উত্থাপন করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যান দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে।
রেহানা আক্তার রানু বলেন, সারা দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার হলেও শুধু রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট।
এর ফলে একদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর গুরুতর চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু অটোরিকশায় ব্যবহৃত সস্তা লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এসব ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
এর পাশাপাশি অদক্ষ চালক এবং ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক ব্যবহারের কারণে অটোরিকশা সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনাও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মোট ৬ হাজার ১১১ জনের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশই অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার ছিলেন।
লাখো মানুষের জীবিকা, তাই ঢালাও উচ্ছেদের বিরোধিতা
তবে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত থাকার বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন রেহানা আক্তার রানু।
তিনি বলেন, এসব যানবাহনকে ঢালাওভাবে উচ্ছেদ বা ডাম্পিং না করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যালের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।
সংসদ সদস্যের উত্থাপিত বিষয়টির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই খাতের সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। তাই কর্মসংস্থানে যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পরিবেশ ও সড়ক নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি বিধিমালা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালার আওতায় অটোরিকশার চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট রুট ঠিক করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এসব যান মহাসড়ক কিংবা প্রধান প্রধান সড়কে চলতে পারবে না।
এ ছাড়া অটোরিকশায় পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার শর্তও নীতিমালায় রাখা হবে।
অটোরিকশার নিবন্ধন নিয়ে অতীতে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, সেটিও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একটি গাড়ির নিবন্ধন নেওয়ার পর সেই একই নম্বর ব্যবহার করে ১০ থেকে ২০টি পর্যন্ত গাড়ি চালানো হয়েছে।
এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধ করতে অটোরিকশা শনাক্তকরণে ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু করা হবে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এ ব্যবস্থার ফলে একদিকে মানুষের কর্মসংস্থান বজায় থাকবে, অন্যদিকে যানজট ও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ চুরি ঠেকাতেও বাড়বে নজরদারি
অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ করতে বিদ্যুৎ বিভাগের নজরদারি আরও বাড়ানো হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ চুরি প্রতিরোধের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকেও নজরদারি জোরদার করা হবে।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়েও সংসদে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন সিগন্যালে এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে।
ভবিষ্যতেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করতে প্রযুক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখা হবে বলে জানান তিনি।