
ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অল্প সময়েই ব্যাপক জনসমর্থন পেয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর প্রকাশ্য সমর্থনে আন্দোলনটি জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
আন্দোলনের শুরুতে সিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও বিরোধী দল—কোনো পক্ষই তরুণদের প্রধান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি যুবসমাজের আস্থাহীনতা থেকেই এই উদ্যোগের জন্ম।
তবে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়, যখন দিল্লিতে সংসদ ভবনের অভিমুখে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হন। ঘটনার পর সিজেপির নেতারা বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা চান এবং বিরোধী দলগুলোও প্রকাশ্যে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় সুযোগ হয়ে উঠেছে। বিরোধীদের সমর্থন পাওয়ায় সিজেপির কর্মসূচি রাজধানীর গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। ওই কর্মসূচিতে পুলিশের কঠোর অবস্থানের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় সব বড় বিরোধী দল আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে।
তবে সিজেপির নেতারা স্পষ্ট করেছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হবেন না এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও পরিকল্পনা নেই। তাদের দাবি, এটি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, কোনো দলীয় কর্মসূচি নয়।
গবেষকদের মতে, বিরোধী দলগুলোর সমর্থনে আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেলেও এতে একটি ঝুঁকিও রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকলে প্রশ্নপত্র ফাঁস, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সংস্কারের মতো মূল দাবিগুলো বড় রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যেতে পারে।
ভারতের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে তরুণদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বড় নির্বাচনের আগে এই অসন্তোষ দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন। তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। আটক হওয়ার আগে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর আঘাত মানে পুরো ভারতের পরিবারের ওপর আঘাত।’
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও তার দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এদিকে সিজেপির মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিরোধী দলগুলোর সমর্থনকে তারা স্বাগত জানালেও আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তাদের ভাষ্য, এই লড়াই সাধারণ শিক্ষার্থী ও মেহনতী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই অব্যাহত থাকবে।