
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র ৩৭ দিনের মাথায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। তবে এই সাফল্যের দাবির মাঝেই বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের তথ্য, যেখানে অন্তত ৩০ লাখ বই ছাপা না করেই কাজ শেষ দেখানোর অভিযোগ উঠেছে ছয়টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড জানিয়েছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য মুদ্রিত ও বাঁধাই করা সব পাঠ্যপুস্তক ৭ ফেব্রুয়ারি শতভাগ সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম আসাদুজ্জামানের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে জানা গেছে। সব বই পাঠানো হয়েছে দাবি করা হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো কিছু শিক্ষার্থী বই পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের সন্ধান মেলে। অভিযোগ অনুযায়ী, ছয়টি ছাপাখানা প্রায় ৩০ লাখ বই ছাপা ছাড়াই সরবরাহ সম্পন্নের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক, ইন্সপেকশন এজেন্ট ও মনিটরিং কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে বই না পেয়ে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়ে।
জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসার পর অভিযুক্ত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো নীরবে বই ছাপানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এখনো কয়েকটি প্রেসে বই মুদ্রণ চলছে। একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উপজেলায় অতিরিক্ত সরবরাহ করা বই কম দামে সংগ্রহ করে নিজেদের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
এনসিটিবির সূত্রে জানা যায়, ছয়টির বেশি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া ডেলিভারি সনদ জমা দেয়। চলতি শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর দায়িত্ব পেয়েছে প্রায় ১০০টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বর্ণমালা প্রিন্টিং, মিরাজ প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, রাব্বিল প্রেস, মহানগর অফসেট প্রেস, আমাজন প্রিন্টিং প্রেস এবং অ্যারিস্টোক্রেট প্রেস এখনো বই মুদ্রণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ইন্সপেকশন এজেন্টদের প্রভাবিত করে কাগজে-কলমে শতভাগ সরবরাহ দেখান। অথচ বাস্তবে তারা ৩০ লাখ বই ছাপায়নি, ফলে প্রকৃত বিতরণ পরিস্থিতি আড়ালেই থেকে যায়।
কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উপজেলা শিক্ষা অফিস ও বিদ্যালয় থেকে অতিরিক্ত বই কম দামে সংগ্রহ করে তা নিজেদের সরবরাহ ঘাটতি পূরণে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। একদিকে মুদ্রণ শেষ না করেই সরবরাহ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে, অন্যদিকে অন্য উৎস থেকে বই এনে হিসাব সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সরেজমিন যাচাই ছাড়াই ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠান সরবরাহ সনদ দিয়েছে এবং তা গ্রহণ করেছে এনসিটিবির বিতরণ শাখা। এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অভিযুক্ত কয়েকটি প্রেসের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী সরকারের সময় বিনা মূল্যের বই ছাপানোয় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও ছিল।
এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, “এবার বই ছাপানোর সব কার্যক্রম আমরা কঠোরভাবে মনিটরিং করছি। এতে অনেক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। কয়েকটি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান বই না ছাপিয়ে ডেলিভারির নথিপত্র উপস্থাপন করেছে। যা বড় অনিয়ম। দ্রুত এসব বই ছাপিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “বই ছাপা ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হলে প্রতি বছরই এ ধরনের সংকট তৈরি হবে।” তিনি দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর বই বিতরণে এমন অনিয়ম পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের ভাষ্য, কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমবে না।
অভিযোগের বিষয়ে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠানের মোবাইল ফোনে চারবার কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।