
দীর্ঘদিনের বৈরিতা, সংঘাত আর যুদ্ধংদেহী মনোভাব কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন এবং অভাবনীয় কূটনৈতিক দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে আজই। সব ধরনের সামরিক উত্তেজনা নিরসনের লক্ষ্যে আজ রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত ও ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে চলেছে। পাকিস্তান ও কাতারের সরাসরি মধ্যস্থতায় একটি বিশেষ ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই চুক্তিটি সই হবে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের ঠিক দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শান্তি চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এই চুক্তি সইয়ের পরপরই আগামী সপ্তাহে দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।
অন্যদিকে মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চুক্তিটি আগামীকালই (আজ রোববার) সই হতে যাচ্ছে। তিনি জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ সবার জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। একই পোস্টে ট্রাম্প বর্তমান পরিস্থিতির প্রশংসা করে উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বর্তমান সম্পর্ক পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনের মেয়াদের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক, মজবুত ও উন্নত।
আমেরিকার সামরিক ও কৌশলগত অর্জনের ইঙ্গিত দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর পোস্টে আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে এলে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বি-২ বোম্বার এবং তাদের দক্ষ পাইলটদের অসামান্য অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হবে। একই সাথে ইরানের গভীর পাহাড়ের নিচে থাকা পারমাণবিক অবশিষ্টাংশগুলো সম্পূর্ণ অপসারণ এবং তা চিরতরে ধ্বংস করার কাজও সফলভাবে সম্পন্ন করা হবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বৃদ্ধি করা হবে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ ও বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসবে। মূলত পাকিস্তান, কাতার, মিসর ও তুরস্কের যৌথ মধ্যস্থতায় গত প্রায় তিন মাস ধরে চলা ধারাবাহিক ও নিবিড় আলোচনার ফসল হিসেবেই এই সমঝোতা স্মারকটি অবশেষে বাস্তব রূপ পাচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সূত্র মারফত জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘ দূরত্ব ও সময়সূচির সুবিধার কথা চিন্তা করেই এই ঐতিহাসিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি ভার্চ্যুয়ালি আয়োজন করা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান ও দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যাতে আগামীকাল সোমবার সকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্বনির্ধারিত ফ্রান্স সফরের আগেই দেশে ফিরে আসতে পারেন, সেই দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এই ভার্চ্যুয়াল চুক্তি স্বাক্ষরের পর আগামী মঙ্গলবার ফ্রান্সে অনুষ্ঠেয় জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এক বিশেষ বৈঠকে বসবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি মিসর, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) শীর্ষ নেতাদের সাথে আলোচনা করবেন। উক্ত হাই-প্রোফাইল বৈঠকে এই শান্তি চুক্তি, যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সম্ভাব্য বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিস্তারিত কথা হবে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য সচল রাখতে হরমুজ প্রণালি থেকে সমুদ্র মাইন অপসারণের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স বা জোট গঠনের বিষয়টিও আলোচনার এজেন্ডায় রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকটি যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে দশকের পর দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটবে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ নিশ্চিত হয়ে স্বস্তি ফিরবে। এদিকে ফ্রান্সে অনুষ্ঠেয় এই বিশেষ বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও সময়সূচির জটিলতার কারণে তিনি এতে অংশ নিতে পারছেন না। একইভাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত থাকছেন না বলে মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
সূত্র: অ্যাক্সিওস