
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক নারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ডাক্তার ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে নজিরবিহীন মারামারি ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। কর্তব্যরত চিকিৎসককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে নিহতের ছেলেকে প্রকাশ্যেই কান ধরে ওঠবস করানোর পর অবশেষে মায়ের মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অপমানজনক এই ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে নেটদুনিয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
গতকাল শনিবার (১৩ জুন) দুপুরের দিকে হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষের সামনে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। এর আগে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দীর্ঘ দুই ঘণ্টা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সমস্ত চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখেন বিক্ষুব্ধ চিকিৎসকেরা।
হাসপাতাল প্রশাসন ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রংপুর শহরের জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূর নাহার বেগমকে শনিবার ভোররাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মারা যান। মৃত্যুর পরপরই চিকিৎসায় চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন নিহতের ছেলে রিফাত হোসেন। এ নিয়ে একপর্যায়ে কর্তব্যরত ডাক্তারদের সাথে রোগীর স্বজনদের তীব্র কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনরত চিকিৎসকদের দাবি, স্বজনদের সেই হামলায় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী এবং ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিব হাসান গুরুতর লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে চিকিৎসকেরা কর্মবিরতির ডাক দেন এবং হামলাকারী রিফাত হোসেনকে সশরীরে হাজির করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ানোর দাবিতে অনড় থাকেন।
বিপরীতে নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ নূর নাহার বেগমকে হাসপাতালে নেওয়ার পরও কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু না করায় তাঁর অকাল মৃত্যু হয়েছে। চোখের সামনে মায়ের এমন আকস্মিক মৃত্যু সইতে না পেরে রিফাত চিকিৎসকদের সাথে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন, যা পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
স্বজনরা আরও অভিযোগ করেন, নূর নাহার বেগমের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের কাউকে তাঁর মরদেহ পর্যন্ত দেখতে দেওয়া হয়নি। এমনকি একপর্যায়ে লাশটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলেও বেশ কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থী জোরপূর্বক তাতে বাধা দেন এবং গাড়ি থেকে লাশ নামিয়ে হাসপাতালের মর্গে নিয়ে আটকে রাখেন।
নিহতের আরেক ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভোরে মা মারা গেছেন, অথচ দুপুর পর্যন্ত আমরা তাঁর মুখ দেখতে পারিনি। বারবার অনুরোধ করেও মরদেহ পাইনি।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিবাদে এবং মায়ের লাশ ফেরতের দাবিতে পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনের রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
এরই মধ্যে দুপুরে হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরের সামনে বিপুলসংখ্যক ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী জড়ো হন। তারা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। স্বজনদের অভিযোগ, একপর্যায়ে পরিচালকের কক্ষের ভেতরেই রিফাতকে কান ধরে ওঠবস করানো হয় এবং এই অপমানজনক শাস্তি দেওয়ার পরেই কেবল মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অবশ্য লাশ আটকে রাখার এই গুরুতর অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আসিফ। তিনি বলেন, “চিকিৎসকদের ওপর হামলার বিচার দাবিতে আমরা আন্দোলন করেছি, কিন্তু কোনো মরদেহ আটকে রাখা হয়নি।”
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রংমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, হাসপাতালের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজে চিকিৎসকদের ওপর হামলার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। পুরো ঘটনাটিকে তিনি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও অমানবিক বলে আখ্যা দেন।
লাশ আটকে রাখার অভিযোগ প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, “মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় অতিরিক্ত ভিড় ছিল। নিরাপত্তার কারণে সেটি সাময়িকভাবে মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর হামলার এই ঘটনায় হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং খুব দ্রুতই থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হবে।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের এ প্রসঙ্গে জানান, হাসপাতাল বা নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।