
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন পোশাক ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চার বছর মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নতুন গভর্নর হয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমান।
বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। এক সময় পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউস এবং আবাসন ব্যবসাতেও যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ অনুযায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে তার যোগদানের তারিখ থেকে ৪ (চার) বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান করা হলো। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তার নেতৃত্বে শুরু হয় ব্যাংক খাতের সংস্কারের কাজ। দেড় বছরের মাথায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বুধবার আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সেখানে তার নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন গভর্নরের সামনে ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম পোশাক ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর সাক্ষাৎকারে গোপন বিষয় প্রকাশ করে শপথ ভেঙেছেন রাষ্ট্রপতি : জামায়াত মোস্তাকুর রহমান ১৯৬৬ সালের ১২ মে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৮৭ সালে বি কম (সম্মান) এবং ১৯৮৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯২ সালে (আইসিএমএবি) থেকে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএমএ) হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে ফেলো সদস্য হন।
তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন্স অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব), এসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব), ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাট্রিজের (ডিসিসিআই) সদস্য এবং সংগঠনগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক, চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড ও আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের রেগুলেটর কমিটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। মো. মোস্তাকুর রহমান একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী এবং জ্যেষ্ঠ আর্থিক প্রশাসন বিশেষজ্ঞ। করপোরেট ফিন্যান্স, এক্সপোর্ট ইকনমিক্স, ইনস্টিটিউশনাল গভার্নেন্স, ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ। এসব ক্ষেত্রে ৩০ বছরের বেশি সময় কাজ করার ও নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে।
ম্যানুফেকচারিং, রিয়েল এস্টেট, এগ্রো-বেজড এন্টারপ্রাইজেস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভেনচার্স ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং, ইনভেস্টমেন্ট ওভারসাইট, গভার্নেন্স ফ্রেমওয়ার্কস ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্প বিনিয়োগ, আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিষয়ক গঠনমূলক সংলাপে তিনি সুনির্দিষ্ট অবদান রেখেছেন। ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমস গভার্নেন্স, ব্যাংকিং এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স, এক্সপোর্ট ফিন্যান্স এন্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট, ইনস্টিটিউশনাল রিস্ক ওভারসাইট, কর্পোরেট এন্ড রেগুলেটরি কমপ্ল্যায়েন্স, ক্যাপিটাল স্ট্রাকচার এন্ড লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট, বোর্ড গভার্নেন্স এন্ড ফিডুসিয়ারি রেসপন্সিবিলিটি, স্ট্র্যাটেজিক ইকনমিক প্ল্যানিং, ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং এন্ড একাউন্ট্যাবিলিটি, স্টেকহোল্ডার এনগেজমেন্ট এন্ড পলিসি ডায়লগ, সাসটেইন্যাবিলিটি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন বিষয়ে তার ব্যাপক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি বর্তমানে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কর্পোরেট অর্থায়ন, ব্যাংকিং সম্পর্ক, মূলধন কাঠামো ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা এক্সপোজার নিয়ন্ত্রণে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। নতুন গভর্নর আর্থিক ব্যবস্থার শাসন, ব্যাংকিং ও শিল্প অর্থায়ন, রপ্তানি অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, কর্পোরেট ও নিয়ন্ত্রক সম্মতি এবং ঝুঁকি তদারকিতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের প্রতি তার অঙ্গীকার ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রমে গতি আনবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোস্তাকুর রহমান বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য কার্যক্রমেও যুক্ত। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা সহায়তা, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ রোগীদের উপশমকারী চিকিৎসা সহায়তা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় তিনি অবদান রেখে আসছেন। অর্থনীতির চলমান চ্যালেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ ও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা মোকাবিলায় তার শিল্প ও আর্থিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নেতৃত্বে নীতি-সংলাপ, শিল্প অর্থায়ন এবং আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কারে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।