
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান চলার মধ্যেই মো. মোহাম্মদ আবু জাফরকে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। এ জন্য তার নিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আবু জাফরকে তিন বছরের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তার মাসিক বেতন ১২ লাখ টাকা নির্ধারণের বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান ঢাকাওয়াচকে বলেন, আবু জাফর সম্প্রতি এমডি নিয়োগসংক্রান্ত সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছেন। তবে তার নিয়োগের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।
তিনি বলেন, ব্যাংক কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। এ জন্য প্রস্তাবিত প্রার্থীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কমিটির সামনে সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হয়। সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি অন্যান্য যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পরই নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিএফআইইউর নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই।
আবু জাফর এর আগে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের ফ্রিজ করা হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে পড়েন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই হিসাব থেকে ১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং ৩০ হাজার মার্কিন ডলার তোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে বিএফআইইউর অনুসন্ধানে বিষয়টি উঠে আসে। এরপর দুর্নীতির দায়ে আবু জাফরকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের এমডি পদ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা একটি চিঠি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবু জাফরের চাকরির অবসান করা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে তার চাকরির অবসান কার্যকর হয়েছে।
তবে চাকরির অবসানের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত অনুসন্ধানও করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধান চললেও নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের
আবু জাফরের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখপাত্র আকতারুল ইসলাম ঢাকাওয়াচকে বলেন, দুদকের অনুসন্ধান বা অভিযোগের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা দণ্ড হয়েছে কি না, সেটি আলাদা বিষয়। এমডি পদে তার নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ার।
অর্থাৎ, কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান থাকা এবং সেই অভিযোগে চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত হওয়া—দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখার কথা জানিয়েছে দুদক।
এমডি পদ শূন্য ন্যাশনাল ব্যাংক
আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটি বর্তমানে শূন্য রয়েছে। ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি আদিল চৌধুরী চলতি বছরের জুলাইয়ে পদত্যাগ করার পর থেকে পদটি খালি রয়েছে।
এমডি নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের মধ্যেও মতবিরোধ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরিচালকদের একটি অংশ আদিল চৌধুরীকে এমডি পদে বহাল রাখার পক্ষে ছিল। অন্য একটি অংশ তার বিরোধিতা করেছিল।
এ নিয়ে বোর্ডে মতবিরোধ তৈরি হওয়ার পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আদিল চৌধুরী পদত্যাগ করেন বলে জানা গেছে।
গত বছরের ৭ জুলাই তিন বছরের চুক্তিতে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন আদিল চৌধুরী। এর আগে মো. তৌহিদুল আলম খানও মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই ব্যাংকটির এমডির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
আবু জাফরের সাক্ষাৎকার নিয়েছে যে কমিটি
গোপন সূত্রে জানা যায়, আবু জাফরের এমডি পদের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডে একজন ডেপুটি গভর্নর, ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) একজন নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক এবং ব্যাংকিং নীতি-সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট কমিটির সামনে সাক্ষাৎকার দিতে হয়। এরপর অন্যান্য যাচাই-বাছাই শেষে নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২০১৩ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকেই অনিয়মের অভিযোগ
আবু জাফর এর আগেও ন্যাশনাল ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৩ সালে ব্যাংকটিতে কর্মরত থাকার সময় তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স ডিভিশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন না করে এবং ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই এফএমসি ডকইয়ার্ড লিমিটেডকে ৪৬০ কোটি টাকা এবং গ্র্যান্ড ট্রেড কোম্পানিকে ২০০ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে অনুমোদন ও ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ করে দেন আবু জাফর।
সে সময় তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে যেসব সিদ্ধান্ত
আবু জাফরের দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ন্যাশনাল ব্যাংকের অভ্যন্তরে পুনঃতদন্ত করা হয়েছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ওই পুনঃতদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়, এফএমসি গ্রুপকে দেওয়া ঋণসুবিধার ক্ষেত্রে সংঘটিত অনিয়মের জন্য আবু জাফর প্রধানত দায়ী নন।
ফলে আবু জাফরের বিষয়ে একদিকে দুদকের অনুসন্ধান এবং অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত—দুটি প্রক্রিয়ায় তার দায়ের বিষয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। এ কারণে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি পদে তার নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের বক্তব্য
এ বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবিনের ফোনে ঢাকাওয়াচের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
তবে ন্যাশনাল ব্যাংকের পিআরও রিজভি ঢাকাওয়াচকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রস্তাবটি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। তার ভাষ্য, এ অবস্থায় প্রক্রিয়াটিকে অনিয়মিত হিসেবে চিত্রিত করা প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মনে করে।
আবু জাফরের সঙ্গেও মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনিও কল রিসিভ করেননি।
ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য সংকট
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ব্যাংক বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকটের মধ্যে রয়েছে।
সবশেষে জরুরি তারল্য সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ১ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। তবে ওই সহায়তার পরও ব্যাংকটির সংকট কাটেনি।