
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধরের ঘটনাকে চরম ‘মব ভায়োলেন্স’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রাকসু এবং ছাত্রশিবির নেতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনাসহ ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেছে প্রগতিশীল বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর যৌথ প্ল্যাটফর্ম ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীমের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্মারকলিপি পেশ করে এসব দাবি উপস্থাপন করেন জোটের শীর্ষ নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পেশ করা স্মারকলিপিতে তুলে ধরা অন্য ৪টি মূল দাবি হলো— রাকসু ভবনে সংঘটিত হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা; গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের মশাল মিছিলে বিগত দিনে চালানো হামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও দোষীদের বিচার করা; ‘জুলাই ৩৬’ হলের শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করার ঘটনা এবং ৭টি আবাসিক হলে পবিত্র কোরআন অবমাননাসহ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সব ঝুলন্ত ঘটনার সুরাহা করা; এবং প্রক্টর অফিসের দায়িত্বরতদের সামনে বেআইনিভাবে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন তল্লাশি, শারীরিক নির্যাতন ও পরবর্তী সময়ে মব সৃষ্টিতে ইন্ধন দেওয়ার অপরাধে ব্যর্থ প্রক্টরিয়াল বডিকে কড়া জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা।
স্মারকলিপিতে ছাত্রজোটের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রবেশ করে সাধারণ তিন শিক্ষার্থীর ওপর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের প্রথম সারির নেতারা যেভাবে পর্যায়ক্রমে 'মব ভায়োলেন্স' চালিয়েছে, তাতে পুরো ক্যাম্পাসে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। পাঠাগারের শান্ত পরিবেশে প্রবেশ করে এমন বর্বর ও তাণ্ডব চালানোর নজিরবিহীন ঘটনাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের চরমভাবে আতঙ্কিত করেছে। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিতদের এমন পেশিশক্তির কুরুচিপূর্ণ প্রদর্শন সারাদেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তিকে চরম ক্ষুণ্ণ করেছে।
কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীকে শাস্তি প্রদান বা তদন্তের একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল প্রশাসনেরই রয়েছে উল্লেখ করে জোট নেতারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিচার কিংবা তদন্ত করার একচ্ছত্র অধিকার শুধু প্রক্টরিয়াল বডির। সেখানে কোনো ছাত্রপ্রতিনিধি অনধিকার চর্চা করতে পারেন না। অথচ সেদিন দায়িত্বপ্রাপ্তদের সামনেই রাকসুর জিএস ও এজিএস বেআইনিভাবে এক শিক্ষার্থীর মোবাইল চেক করেন এবং তাকে শারীরিক লাঞ্ছনা করেন। প্রক্টররা এই জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার অপব্যবহার নীরবে প্রশ্রয় দেওয়ায় রাবির গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় তাদের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বিগত দিনের হামলার স্মারক স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্মারকলিপিতে শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলা হয়, গত বছরের ২৭ মে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারের দায়মুক্তির প্রতিবাদে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের আয়োজিত মশাল মিছিলে অতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রশিবির। যার মাধ্যমে অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নোংরা চর্চা ফিরে আসে। সেই হামলার যাবতীয় ছবি ও ভিডিও প্রমাণ প্রক্টরদের হাতে তুলে দেওয়া হলেও এক বছরেরও বেশি সময়ে কোনো বিচার মেলেনি। এই দীর্ঘ বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত সন্ত্রাসীদের দিন দিন আরও বেপরোয়া ও আগ্রাসী বানিয়ে তুলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কড়া সমালোচনা করে তারা আরও বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতে সন্ত্রাসবাদ, হল দখল, সিট বাণিজ্য, হাতুড়িপেটা, অস্ত্রের মহড়া, রগকাটা ও লাশের রাজনীতির এক কলঙ্কিত অধ্যায় পার করতে হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা সেই পুরোনো অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিন দিন এক অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পুরো বিষয়ের সার্বিক সারসংক্ষেপ তুলে ধরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল কড়া ভাষায় বলেন, মব ভায়োলেন্স প্রশাসনের একটা ধারাবাহিক বিচারহীনতার পরিণত রূপ। ৫ আগস্টের পরে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মব ভায়োলেন্সের’ ঘটনা দেখেছি। দেখেছি গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মশাল মিছিলে হামলার মত ঘটনা। এসব ঘটনায় আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। প্রমাণসহ প্রক্টরিয়াল বডির কাছে বিচার চেয়েছি। এখনো পর্যন্ত তারা কোনো রকমের তদন্ত রিপোর্ট দেখাতে পারেনি। ফলে তাদের এই প্রশ্রয় সন্ত্রাসের এই বাস্তবতা তৈরি করেছে।