
জাতীয় সংসদের অধিবেশনের শুরুতেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ সংসদীয় কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, এই ভাষণ কি রাষ্ট্রপতি নিজেই লিখে থাকেন, নাকি এর পেছনে থাকে সরকারের কোনো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া? বাস্তবে এই ভাষণ প্রস্তুতের পদ্ধতি বেশ সুসংগঠিত এবং এতে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ থাকে।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। Constitution of the People’s Republic of Bangladesh-এর Article 73(2) অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং প্রতি বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতিকে সংসদে ভাষণ দিতে হয়। ভাষণ শেষে সংসদ সদস্যরা ‘Motion of Thanks’ বা ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং সেই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই রীতি মূলত ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় প্রথা থেকে অনুসৃত।
তবে সংসদে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেন, তা সাধারণত তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় এটি মূলত সরকারের নীতিমালা ও পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ। ফলে ভাষণের খসড়া প্রস্তুত করে সরকার এবং রাষ্ট্রপতি সেই অনুমোদিত বক্তব্যই সংসদে পাঠ করেন।
এই ভাষণ তৈরিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করে। পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা PMO। এখানে সরকারের অগ্রাধিকার, নীতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বা Cabinet Division ভাষণ প্রস্তুতের মূল সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে খসড়া তৈরি করে।
প্রতিটি মন্ত্রণালয় তাদের নিজ নিজ খাতের অর্জন, পরিকল্পনা এবং নীতিমালার তথ্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। উদাহরণ হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থনৈতিক নীতির বিষয়গুলো দেয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুলে ধরে পররাষ্ট্রনীতির দিকগুলো এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় শিক্ষা সংস্কার ও সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার কথা। এসব তথ্য একত্রিত করে ভাষণের মূল কাঠামো তৈরি করা হয়।
খসড়া তৈরির জন্য একটি বিশেষ দল কাজ করে। এই দলে সাধারণত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা থাকেন। তারা যৌথভাবে ভাষণের চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত ও সম্পাদনা করেন।
ভাষণ তৈরির কাজ সাধারণত ঢাকার সচিবালয়ে অবস্থিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সম্পন্ন হয়। কখনও কখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা জাতীয় সংসদ সচিবালয়েও এ কাজের অংশ সম্পন্ন হতে পারে। খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর তা পাঠানো হয় বঙ্গভবনে, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। সেখানে ভাষাগত ছোটখাটো সংশোধন করা হতে পারে।
ভাষণ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়। প্রথমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাদের তথ্য পাঠায়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সেই তথ্যের ভিত্তিতে খসড়া প্রস্তুত করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খসড়াটি পর্যালোচনা করে এবং পরে এটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। মন্ত্রিসভা ভাষণ অনুমোদন করলে অনুমোদিত কপি বঙ্গভবনে পাঠানো হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি সেই ভাষণ জাতীয় সংসদে পাঠ করেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাধারণত ভাষণের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করেন না। মন্ত্রিসভা অনুমোদিত বক্তব্যই তিনি সংসদে হুবহু পাঠ করেন। ফলে এটি মূলত সরকারের নীতি ও অবস্থানের প্রতিফলন, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত মতামত নয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হওয়ার পর সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কয়েকদিন ধরে সেই ভাষণের ওপর আলোচনা চলে। সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষই এতে অংশ নেয় এবং শেষে ভোটের মাধ্যমে ধন্যবাদ প্রস্তাব পাস করা হয়।