
নদীই যাদের জীবন-জীবিকা, সেই জেলেদের নৌকা এখন ঘাটেই বাঁধা—ডিজেলের তীব্র সংকটে শরীয়তপুরের নদীপাড়ে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চরমোহন গ্রামের ৬০ বছর পেরোনো জেলে সিরাজুল ইসলাম ঢালী প্রায় চার দশক ধরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু গত সাত দিন ধরে তিনি নৌকা নিয়ে নদীতে যেতে পারছেন না। কারণ, বাজারে ডিজেল নেই। তার ভাষ্য, দীর্ঘ জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হননি।
একই সংকটে পড়েছেন জেলার আরও কয়েক হাজার জেলে। নদীতীরবর্তী হাটবাজারগুলোতে জ্বালানি তেলের অভাবে নৌকা চালানো যাচ্ছে না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে তেল কিনে নদীতে নামছেন। তাদের অভিযোগ, প্রতি লিটার ডিজেলে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। ফলে পুরো মৎস্য খাতেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, “অভাবের সংসারে ১৫ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে নদীতে নামি। এত বছরেও ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। শুধু নৌকায় ইঞ্জিন বসেছে। এখন সেই ইঞ্জিনই বিপদের কারণ হয়েছে। বাজারে তেল পাচ্ছি না তাই সাত দিন ধরে নৌকা বন্ধ। পরিবার ও শ্রমিকদের নিয়ে বিপাকে আছি।”
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুরের ওপর দিয়ে পদ্মা ও মেঘনা নদী প্রবাহিত হয়েছে। জাজিরার নাওডোবা থেকে গোসাইরহাট উপজেলার নলমুরি পর্যন্ত প্রায় ৭১ কিলোমিটার নদীপথে প্রায় ৩৩ হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। আগে যেখানে বইঠাচালিত নৌকা বেশি ছিল, এখন অধিকাংশ নৌকাই ইঞ্জিনচালিত। জেলায় প্রায় ১২ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে, যেগুলো চালাতে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।
নদীপাড়ের বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যবসায়ীরা জেলেদের কাছে ডিজেল বিক্রি করে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছেন না। এ পরিস্থিতির সুযোগে কোথাও কোথাও বেশি দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
গোসাইরহাট উপজেলার গরীবেরচর এলাকার জেলে আবু সুফিয়ান (৪০) পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পদ্মা নদীতে মাছ ধরেন। ঈদের পরদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে তেল সংকটে পড়ে তিনি নড়িয়ার সুরেশ্বর এলাকায় টানা পাঁচ দিন ধরে আটকে আছেন।
আবু সুফিয়ান বলেন, “সুরেশ্বর বাজারে দুই লিটার করে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। তাও প্রতি লিটার ১৬০ টাকা। এই তেল দিয়ে দুই-তিন ঘণ্টা মাছ ধরা যায়। কোনো দিন মাছ পাই, কোনো দিন পাই না। এভাবে কত দিন চলবে, জানি না।”
সুরেশ্বর বাজারের ব্যবসায়ী রিফাত হোসেন জানান, তিনি চাঁদপুরের মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপো থেকে তেল এনে বিক্রি করেন। তার ভাষ্য, প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জেলেদের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, “ঈদের আগপর্যন্ত জেলেদের জ্বালানি তেল পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের পর নদীতীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে তেলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে জেলেরা কিছু কিছু স্থানে জ্বালানি পাচ্ছেন না, এমন তথ্য পেয়েছি। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিগগিরই এমন সংকট কেটে যাবে।”