
পাকিস্তানের উত্তপ্ত প্রদেশ বেলুচিস্তানে বলপ্রয়োগপূর্বক নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে সোচ্চার কণ্ঠস্বর মাহরাং বেলুচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ২০২৪ সালের একটি গণবিক্ষোভ চলাকালে আধাসামরিক বাহিনীর এক সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাকে এই সাজা দেওয়া হলো।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের দায়ে সাজা
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বেলুচ ইউনিটি কমিটি’ (বিওয়াইসি)-এর অন্যতম শীর্ষ নেত্রী মাহরাং বেলুচ এবং তার সহকর্মী সমাজকর্মী সিবগাতুল্লাহকে হত্যা ও সন্ত্রাস ছড়ানোর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে এই রায়কে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মাহরাং বেলুচ নিজে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, বেলুচ জনগণের অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বলপূর্বক দমন করতেই এই আইনি চাল চালানি হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ও আসামিপক্ষের বয়ান
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালে উপকূলীয় শহর গোয়াদর বন্দরে আয়োজিত একটি সমাবেশে মাহরাং ও সিবগাতুল্লাহ উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে উপস্থিত জনতাকে উত্তেজিত করে তোলেন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এর জের ধরে ৩০-৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল লাঠিসোঁটা ও পাথর নিয়ে আধাসামরিক বাহিনীর একটি যানে হামলা চালায়। সে সময় দলের অন্য সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সৈনিক শাব্বির আহমেদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
কোয়েটার বিশেষ সন্ত্রাসবিরোধী আদালত তাদের রায়ে উল্লেখ করেছেন, "বেলুচ ও সিবগাতুল্লাহ ‘বেলুচ ইউনিটি কমিটির অবৈধ সমাবেশে সক্রিয় ছিলেন এবং ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারি কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডে তাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল।’"
কারাদণ্ডের পাশাপাশি নিহতের পরিবারকে ২ লাখ পাকিস্তানি রুপি (৭১৯ মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। অবশ্য শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন দুই অধিকারকর্মী। এমনকি বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা এবং তাদের আইনজীবীরা পুরো আইনি কার্যক্রম বর্জন করেছিলেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের সূত্রমতে, বিভিন্ন মামলায় গত দুই বছর ধরেই কারান্তরীণ রয়েছেন তারা।
ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অধিকারকর্মীরা
এই বিতর্কিত রায়ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনার তাগিদ দিয়েছে হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি)। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারের পক্ষে কথা বলাকে চরমপন্থার মতোই বিবেচনা করার নীতি বজায় রেখেছে। এতে প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে।
আইনি লড়াইয়ে বাধা পাওয়ার অভিযোগ তুলে মাহরাংয়ের বোন ও আইনজীবী নাদিয়া বেলুচ এবং তাদের প্যানেল এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, একটি গোপন ও অজ্ঞাত আদালত এই রায় দিয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের সঠিকভাবে জেরা করার সুযোগ পাননি।
বিশ্বমঞ্চ থেকেও এই রায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। বিশ্বখ্যাত সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ এই বিচার প্রক্রিয়াকে ‘ন্যায়বিচারের প্রহসন’ বলে মন্তব্য করেছেন। একইসঙ্গে পুরো বিচার গোপনীয়তার মধ্যে পরিচালিত হয়েছে এবং পাকিস্তান সরকার ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে সরকারি পর্যায় থেকে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, প্রসিকিউটরদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ রয়েছে। এই মামলাটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় যাত্রা
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বিবিসির প্রভাবশালী ১০০ নারীর তালিকায় জায়গা করে নেওয়া মাহরাং বেলুচের এই আন্দোলনের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০০৯ সালে তৎকালীন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তার বাবাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নামেন তিনি। এর দুই বছর পর তার বাবার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যাতে স্পষ্ট নির্যাতনের ছাপ ছিল।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালের শেষভাগে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের বিচারের দাবিতে শত শত নারীকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে ১ হাজার মাইল (প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার) দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন মাহরাং।
বহু বছর ধরে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত বেলুচিস্তানে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সম্মুখ সারিতে থেকে লড়ছে মাহরাংয়ের সংগঠন বিওয়াইসি। যদিও পাকিস্তান সরকারের দাবি, এই সংগঠনের সঙ্গে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে—যা বরাবরই দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে বিওয়াইসি।