
ভারতের জাতীয় পরীক্ষাগুলোতে উপর্যুপরি প্রশ্নফাঁস ও লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগে দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। এবার তাঁর এই দাবি ও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদ থেকে অপসারণ করে তাঁর জায়গায় সোনম ওয়াংচুককে দেশের নতুন শিক্ষামন্ত্রী করার জোর দাবি তুলেছেন আম আদমি পার্টির (আপ) শীর্ষনেতা ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) যন্তর মন্তরে অনশনরত ওয়াংচুকের সঙ্গে সশরীরে দেখা করতে গিয়ে তিনি এই বিস্ফোরক দাবি জানান। খবর এনডিটিভির।
নিট (NEET) মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাসহ জাতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নানাবিধ অনিয়মের প্রতিবাদে দীর্ঘ ১৯ দিন ধরে ওয়াংচুক সেখানে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন।
যন্তর মন্তরে সাক্ষাত শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) হিন্দিতে দেওয়া এক পোস্টে অরবিন্দ কেজরিওয়াল লিখেছেন:
"ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে সোনম ওয়াংচুককে দেশের শিক্ষামন্ত্রী করা উচিত।"
অনশনস্থলে উপস্থিত হয়ে গণমাধ্যমকে কেজরিওয়াল বলেন, ভারতে প্রতি বছরই কোনো না কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে, যার ফলে দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন:
"সরকারের উচিত শিক্ষার্থী এবং সোনম ওয়াংচুকের কথা শোনা। পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।"
যন্তর মন্তরে এসে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই আন্দোলনস্থলে পা রাখতেই তাঁর মনে ২০১১ সালের ঐতিহাসিক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি ভেসে উঠেছে। সে সময় তিনি প্রবীণ সমাজকর্মী আন্না হাজারের সঙ্গে ঠিক একই স্থানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অনশন করেছিলেন।
সেদিনের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন:
"২০১১ সালের ৪ এপ্রিলের কথা আজ মনে পড়ছে। তিন বছর পর সেই সরকার ক্ষমতা হারিয়েছিল, কারণ তারা মানুষের কথা শোনেনি এবং অহংকার জবাবদিহিতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।"
২৫ দিন ছাড়াল তীব্র আন্দোলন, ২০শে জুলাই 'চলো সংসদ'
উল্লেখ্য, সোনম ওয়াংচুক গত ২৮ জুন থেকে নিজের আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। এটি মূলত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বে চলমান একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের অংশ। এই সংগঠনটি গত ২৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগ দাবি করছে।
নিজেদের দাবি আদায়ে আগামী ২০ জুলাই—ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে তারা রাজধানীজুড়ে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
সংকটাপন্ন সোনম ওয়াংচুক, তবুও ভাঙবেন না অনশন
টানা ১৯ দিনের কঠিন অনশনে সোনম ওয়াংচুকের শরীর মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং ইতিমধ্যেই তাঁর ওজন ৯ কেজিরও বেশি কমে গেছে। তাঁর সার্বক্ষণিক তদারকিতে থাকা চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা এখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
সর্বশেষ চিকিৎসাগত পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাঁর রক্তে শর্করার (ব্লাড সুগার) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারে, হৃদস্পন্দন মিনিটে ৭২ বার এবং শোয়া ও বসা অবস্থায় রক্তচাপ (ব্লাড প্রেসার) যথাক্রমে ১০৫/৬১ ও ১০১/৬৫ রেকর্ড করা হয়েছে। শরীরে ক্ষতিকর কিটোনের মাত্রা সামান্য কমলেও ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা এখনও আশঙ্কাজনকভাবে বেশি, যা তাঁর পেশি ক্ষয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শারীরিক অবস্থা এতটা নাজুক হওয়া সত্ত্বেও বুধবার রাতে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এখনই এই অনশন ভাঙবেন না। পরীক্ষায় বড় ধরনের কোনো শারীরিক ঝুঁকির লক্ষণ পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
ভিডিও বার্তায় তিনি তাঁর অনুসারী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন—তাঁকে অনশন ভাঙার অনুরোধ না করে, সবাই যেন আগামী ২০ জুলাইয়ের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিটিকে সফল করতে সর্বাত্মকভাবে মাঠে কাজ করেন।