
সুপারইয়টে বিলাসিতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতীক হিসেবে সাধারণত মালিকের বিশাল মাস্টার স্যুটকেই দেখা হয়। কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদের ৪৩৯ ফুট দীর্ঘ বিলাসবহুল ইয়ট ‘সেরিন’-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শয়নকক্ষটি সেই ধারণা থেকে একেবারেই আলাদা।
মূল মালিকের স্যুট থেকে তিন ডেক নিচে অবস্থিত এই কক্ষটির নাম ‘সি কেবিন’। আকার কিংবা চাকচিক্য দিয়ে অতিথিদের মুগ্ধ করা এর উদ্দেশ্য নয়। বরং সমুদ্রের ওপর ইয়ট চলার সময় যাত্রীকে যতটা সম্ভব স্বস্তিতে ঘুমানোর সুযোগ করে দেওয়াই কক্ষটির নকশার প্রধান লক্ষ্য।
সৌদি যুবরাজ সমুদ্রযাত্রার সময় অসুস্থতাবোধ করেন বলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই কারণেই ‘সেরিন’-এর এই বিশেষ কেবিন নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া কিংবা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে ইয়টের উঁচুতে থাকা বিশাল মালিকের স্যুটের বদলে এই বালিনিজ ধাঁচের কক্ষটি তুলনামূলক শান্ত ও স্থির পরিবেশ দেয়।
এখানে নকশার অগ্রাধিকার চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করা নয়; বরং উত্তাল সমুদ্রে ইয়টের দোল খাওয়ার অনুভূতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।
নকশার পেছনে রয়েছে নৌযানের বিজ্ঞান
১৩৪ মিটার দীর্ঘ ‘সেরিন’-এর দ্বিতীয় ডেকের মাঝামাঝি অংশে, ডান দিকে রয়েছে ‘সি কেবিন’। ইয়টের এই অবস্থানকে তুলনামূলক স্থিতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নৌযানের নকশাবিদ্যার সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঢেউয়ের বিপরীতে চলার সময় ইয়টের সামনের অংশে ওঠানামার মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। পেছনের অংশে আবার দুলুনি ও কম্পনের পাশাপাশি প্রপেলারের কারণে সৃষ্ট নড়াচড়াও বেশি অনুভূত হয়।
এর সঙ্গে ওপরের ডেকগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইয়ট দুললে এসব ডেক তুলনামূলক বড় পরিসরে ওঠানামা করে।
অন্যদিকে, ইয়টের নিচের দিকে এবং মাঝামাঝি অংশে থাকা কেবিন নৌযানের দোলা ও ওঠানামার স্বাভাবিক কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে সেখানে নড়াচড়া তুলনামূলক কম অনুভূত হয়।
‘সেরিন’-এ আধুনিক স্ট্যাবিলাইজার বা দুলুনি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রয়েছে। এগুলো ইয়টের পাশ থেকে পাশে দোলার মাত্রা অনেকটা কমিয়ে দেয়। তবে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় কোনো স্ট্যাবিলাইজারই সব ধরনের নড়াচড়া পুরোপুরি থামাতে পারে না।
তাই সমুদ্রে চলার সময় অসুস্থতাবোধ করেন এমন কোনো ব্যক্তির জন্য ইয়টের নিচের দিকে ও মাঝামাঝি অবস্থানে ঘুমানোর ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
বালিনিজ নকশায় তৈরি শান্ত শয়নকক্ষ
‘সি কেবিন’-এর সাজসজ্জায় জাঁকজমকের বদলে রয়েছে সংযত বিলাসিতা। ঘরের প্রধান আকর্ষণ পেছনের দিকে মুখ করা একটি ডাবল বেড।
বিছানার ওপরের ছাদটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে তা ঐতিহ্যবাহী বালিনিজ খড়ের ছাদের নিচের অংশের মতো দেখায়।

মাটির কাছাকাছি রঙের উপকরণ এবং আধুনিক বালিনিজ সাজসজ্জা পুরো কক্ষটিকে শান্ত কোনো সৈকত অবকাশকেন্দ্রের মতো আবহ দিয়েছে। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি হেডবোর্ড ঘুমানোর জায়গাটিকে খোলা ধরনের বাথরুম থেকে পৃথক করেছে।
কক্ষটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো বড় আকারের একটি শেল দরজা। দরজাটি ভাঁজ করে নিচে নামানো হলে সেটি ব্যক্তিগত জলপারের বারান্দায় পরিণত হয়।
ইয়ট যখন শান্ত সমুদ্রে নোঙর করা থাকে, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে প্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠের সমান উচ্চতায় থাকার অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। তবে ইয়ট চলার সময় ওই বারান্দা বন্ধ রাখা হয়।
অর্থাৎ, এই কক্ষের মূল উদ্দেশ্য নিছক বিলাসী অবকাশযাপন নয়। সমুদ্রে চলমান ইয়টে আরাম করে ঘুমানোর জন্যই এটিকে বিশেষভাবে ব্যবহারিক করে তৈরি করা হয়েছে।
ইয়টটির ডিজাইনার পাসকেল রেমন্ড একসময় এই কক্ষকে ‘সেরিন’-এর অন্যতম আকর্ষণীয় ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষটির নকশায় মাটির সঙ্গে এক ধরনের ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি রয়েছে।
রান্নাঘর, স্পা ও মালিকের স্যুট—সবই কাছাকাছি
‘সি কেবিন’-এর অবস্থানও ব্যবহারিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে। এর পাশেই রয়েছে অতিথিদের রান্নাঘর।

ফলে রাতে হালকা কিছু খাওয়ার প্রয়োজন হলে কর্মীদের আলাদা করে ডাকতে হয় না। একই কারণে খাবারের জন্য কয়েক ডেক ওপরে বা নিচে যাওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না।
কেবিনটির পেছনে অল্প দূরত্বেই রয়েছে স্পা ও বিচ ক্লাব। এর পাশাপাশি একটি ব্যক্তিগত লিফটের মাধ্যমে কক্ষটি সরাসরি পঞ্চম ডেকে অবস্থিত মূল মালিকের স্যুটের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।
ফলে মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য কার্যত দুটি মাস্টার বেডরুমের ব্যবস্থা রয়েছে ‘সেরিন’-এ।
ইয়ট নোঙর করা থাকলে আরাম, খোলামেলা পরিবেশ ও চারপাশের দৃশ্য উপভোগের জন্য রয়েছে বিশাল মূল স্যুট। আর সমুদ্রযাত্রার সময় শান্ত পরিবেশে ঘুমানোর জন্য রয়েছে নিচের অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি ‘সি কেবিন’।
ধারণাটি পুরোনো, কিন্তু ‘সেরিন’-এর বিন্যাস আলাদা
ইয়টের নিচের দিকে এবং মাঝামাঝি অংশে এমন কেবিন রাখার ধারণা একেবারে নতুন নয়। বড় আকারের কয়েকটি ইয়টেও দুলুনি কম অনুভব করার জন্য হালের মাঝামাঝি নিচের ডেকগুলোতে এ ধরনের কেবিন রাখা হয়েছে।
তবে ‘সেরিন’-এর ‘সি কেবিন’-কে আলাদা করে তুলেছে এর বিস্তৃত বালিনিজ সাজসজ্জা, কক্ষটির সঙ্গে সমুদ্রের সরাসরি সংযোগ এবং মালিকের ব্যক্তিগত স্যুটের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা।
ভাসমান প্রাসাদের মতো ‘সেরিন’
ইতালির ফিনকান্তিয়েরি নির্মিত ‘সেরিন’ ২০১১ সালে পানিতে নামানো হয়। এটি ইতালিতে নির্মিত সবচেয়ে বড় ইয়টগুলোর একটি।

ইয়টটির দৈর্ঘ্য ৪৩৯ ফুট বা ১৩৪ মিটার এবং প্রস্থ ৬০ দশমিক ৭ ফুট বা ১৮ দশমিক ৫ মিটার।
এস্পেন ওইনোর নকশা করা ইয়টটির বাইরের অংশে রয়েছে সাতটি বিশাল ডেক। অভ্যন্তরীণ অংশের নকশা করেছে রেমন্ড ল্যাংটন ডিজাইন।
বিশাল আয়তনের পাশাপাশি ইয়টটির ভেতরে তুলনামূলক ছোট ও ব্যক্তিগত আবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আটটি এমটিইউ ৪০০০ সিরিজের ইঞ্জিনে চলে ‘সেরিন’। ইয়টটির স্বাভাবিক চলার গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৫ নট এবং সর্বোচ্চ গতি ২০ নট।
এতে সর্বোচ্চ ২৪ জন অতিথির থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে ১২টি কেবিন। অতিথিদের সেবা দিতে কাজ করেন ৫২ জন কর্মী। এসব তথ্য চার্টার ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেলিকপ্টার ওঠানামার জায়গা থেকে সাবমেরিন হ্যাঙ্গার
‘সেরিন’-এর বিলাসবহুল সুবিধার তালিকাও বেশ দীর্ঘ।
ইয়টটিতে রয়েছে হেলিকপ্টার ওঠানামা ও অবতরণের দুটি জায়গা। এর একটি প্রয়োজন অনুযায়ী সুইমিংপুল অথবা নাচের মঞ্চে রূপান্তর করা যায়।

এ ছাড়া রয়েছে সাবমেরিন রাখার জন্য আলাদা হ্যাঙ্গার। আছে ‘টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত পানির নিচের ‘নিমো রুম’।
ইয়টটিতে আরও রয়েছে গম্বুজ আকৃতির ফায়ারপ্লেসসহ একটি পর্যবেক্ষণ লাউঞ্জ, সম্মেলনকক্ষ, পিয়ানো লাউঞ্জ এবং খোলা আকাশের নিচে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা।
এর পাশাপাশি আছে বিচ ক্লাব, বিউটি সেন্টার, হাম্মাম, সনা, স্টিম রুম এবং একাধিক স্পা পুল।
তবে ‘সেরিন’-এর সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সুবিধাগুলোর একটি হলো এর বিখ্যাত ‘স্নো রুম’।
ইয়টের ভেতরেই নামে তুষার
‘সেরিন’-এর স্নো রুমের তাপমাত্রা প্রায় ১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় মাইনাস ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামিয়ে আনা সম্ভব।
শুধু ঠান্ডা পরিবেশই নয়, কক্ষটির ছাদ থেকে সত্যিকারের তুষার পড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

অতিথিরা চাইলে এই বরফশীতল কক্ষ থেকে সরাসরি সনা, হাম্মাম অথবা উষ্ণ স্পা পুলে যেতে পারেন।
মধ্যপ্রাচ্যের মতো উষ্ণ অঞ্চলে চলাচলকারী একটি ইয়টের জন্য তীব্র গরম থেকে স্বস্তি পাওয়ার এটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী একটি ব্যবস্থা।
আড়ম্বরের নিচে ‘সি কেবিন’-এর আলাদা গুরুত্ব
সবকিছু মিলিয়ে ‘সেরিন’-এর বিলাসিতা যে চোখ ধাঁধানো, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে ইয়টটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি সম্ভবত লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সেই ‘সি কেবিন’।
মালিকের বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ মূল স্যুটের কয়েক ডেক নিচে থাকা অপেক্ষাকৃত ছোট এই বালিনিজ ধাঁচের কক্ষটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বিলাসিতা মানেই সবসময় আকার, চাকচিক্য কিংবা আড়ম্বর নয়। কখনো কখনো আরাম, স্থিরতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী নকশাই বিলাসিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: লাক্সারিলঞ্চেস