
ইতিহাস গড়ার একদম দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও শেষ মুহূর্তের চরম স্নায়ুযুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হোয়াইটওয়াশের মহাকাব্যিক সুযোগ হাতছাড়া করল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে আগেই সিরিজ নিজেদের পকেটে পুরলেও, শেষ ওয়ানডেতে অসিদের হোয়াইটওয়াশের লজ্জায় ডোবাতে পারল না টাইগাররা। মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধশ্বাস ও হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে ৩ বল বাকি থাকতে মাত্র ১ উইকেটের নাটকীয় জয় পেয়ে কোনোমতে হোয়াইটওয়াশ এড়াল ছয়বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার জয়ের নায়ক ওপেনার কুপার কনোলি, যিনি দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সাজঘরে ফেরেন। তিনি ১৩৪ বলে ১৩টি চার ও ৬টি ছক্কায় সর্বোচ্চ ১৪৯ রানের এক টর্নেডো ইনিংস খেলেন। দলের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯ রান আসে মার্নাস লাবুশেনের ব্যাট থেকে। অন্যদিকে, বল হাতে বাংলাদেশ দলের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন পেসার শরীফুল ইসলাম; তিনি ১০ ওভারে মাত্র ৪৮ রান খরচ করে একাই শিকার করেন ৬টি উইকেট।
এর আগে প্রথম দুই ম্যাচে অসিদের অনায়াসে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২১ বছর পর দ্বিতীয় জয়ের স্বাদ পাওয়ার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
আজ রোববার মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় স্বাগতিক বাংলাদেশ। তবে ইনিংসের প্রথম ওভারেই বড় ধাক্কা খায় টাইগাররা। আগের ম্যাচে ৪২ রান করা ওপেনার সৌম্য সরকার আজ মাত্র ২ রান করেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন।
এরপর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে ৫১ রানের এক জুটি গড়ে সাজঘরে ফেরেন অপর ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম, আউট হওয়ার আগে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১৯ রান। তবে উইকেটে থিতু হয়েও ইনিংস বড় করতে পারেননি অধিনায়ক শান্ত; ৫০ বল খেলে মাত্র ২৪ রান করে বিদায় নেন তিনি।
দলীয় ৬১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে যখন বাংলাদেশ ব্যাকফুটে, তখন দলের হাল ধরেন লিটন কুমার দাস ও তাওহীদ হৃদয়। চতুর্থ উইকেটের জুটিতে তাঁরা ১০৯ বলে মূল্যবান ৯৫ রান তোলেন। তবে দলীয় ১৫৩ রানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়েন লিটন দাস। তিনি ৭৮ বলে চারটি চার ও দুটি ছক্কার সাহায্যে ৫৮ রানের একটি দারুণ ইনিংস খেলেন।
লিটন মাঠ ছাড়ার পর তাওহীদ হৃদয়ের সঙ্গে জুটি বাঁধেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। এই দুজনে মিলে ৮১ বলে ৯০ রানের আরেকটি লড়াকু পার্টনারশিপ গড়েন। দলীয় ২৪৬ রানে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে বিদায় নেন দুর্দান্ত খেলতে থাকা হৃদয়। সাজঘরে ফেরার আগে তিনি ৮৮ বলে ৮টি বাউন্ডারির সাহায্যে খেলেন ৮৩ রানের এক ঝকঝকে ইনিংস।
শেষদিকে ৫১ বলে ৫টি চার ও একটি ছক্কার সাহায্যে ৫১ রান করে অপরাজিত থাকেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। নির্ধারিত ৫০ ওভারের খেলা শেষে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৭৪ রান।
২৭৫ রানের মাঝারি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দারুণ সূচনা করে সফরকারী অস্ট্রেলিয়া। উদ্বোধনী জুটিতে স্কোরবোর্ডে ৪০ রান যোগ করার পরই নাটকীয়ভাবে মাত্র ৩ বলের ব্যবধানে ২ উইকেট হারিয়ে বসে তারা।
বাংলাদেশ দলের গতি তারকা শরীফুলের বলে ক্যাচ তুলে দিয়ে মাঠ ছাড়েন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার জশ ইংলিস। তিনি ১২ বলে চারটি বাউন্ডারির সাহায্যে করেন ২১ রান। এরপর ওয়ান ডাউনে নামা ম্যাট রেনশ নিজের ফেস করা দ্বিতীয় বলেই বোল্ড হয়ে শূন্য হাতে বিদায় নেন।
কিছুক্ষণ পর জাতীয় দলের অলরাউন্ডার সৌম্য সরকারের এক অবিশ্বাস্য ও চোখধাঁধানো ক্যাচে পরিণত হয়ে সাজঘরে ফেরেন অসি তারকা ব্যাটসম্যান অ্যালেক্স ক্যারি। দলীয় ৭০ রানে ১৬ বলে মাত্র ৮ রান করে আউট হন তিনি।
চতুর্থ উইকেটে ওপেনার কুপার কনোলির সঙ্গে ৭৭ বলে ৬৪ রানের এক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মার্নাস লাবুশেন। দলীয় ১৩৪ রানে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে ৪৫ বলে ২৩ রান করা লাবুশেনকে ফিরিয়ে এই জুটি ভাঙেন টাইগার বোলাররা। এরপর পঞ্চম উইকেটে ক্যামেরন গ্রিনের সঙ্গে জুটি বেঁধে কুপার কনোলি দলকে জয়ের একদম কাছাকাছি নিয়ে যান।
খেলার একপর্যায়ে ৪৫ ওভার শেষে ৫ উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিল ২৬৬ রান। জয়ের জন্য শেষ ৩০ বলে অসিদের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৯ রান, হাতে ছিল ৫টি উইকেট। খেলার এই অবস্থায় যখন মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া হেসেখেলেই ম্যাচটি জিতে যাবে, ঠিক তখনই মঞ্চে রূপকথার মতো আবহ তৈরি করে বাংলাদেশি বোলাররা। মাত্র ৫ রানের ব্যবধানে ৪টি উইকেট শিকার করে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো কোণঠাসা ও ম্যাচ থেকে ছিটকে ফেলে বাংলাদেশ দল।
৪৬তম ওভারে দুর্দান্ত বোলিং ভেলকি দেখান শরীফুল; তিনি মাত্র ১ রান খরচ করে তুলে নেন গুরুত্বপূর্ণ ২ উইকেট। ৪৭তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমান খরচ করেন মাত্র ৩ রান। এরপর ৪৮তম ওভারে বোলিংয়ে এসে কোনো রানই দেননি শরীফুল, মেডেনসহ নেন আরও ১ উইকেট।
জয়ের জন্য শেষ ১২ বলে অস্ট্রেলিয়ার দরকার ছিল ৫ রান, আর বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ২টি উইকেট। ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজ ২ রান খরচ করলেও অস্ট্রেলিয়ার সেট ব্যাটসম্যান তথা সেঞ্চুরিয়ান কুপার কনোলিকে আউট করে গ্যালারিতে জয়ের আশার আলো জ্বালান।
শেষ ওভারে জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ৩ রান, আর বাংলাদেশের দরকার ছিল শেষ ১টি উইকেট। বল হাতে আসেন তাসকিন আহমেদ। শেষ ওভারের প্রথম বলে তিনি ১ রান দিলে স্ট্রাইকে আসেন অ্যাডাম জাম্পা। দ্বিতীয় বলটি ডট খেলেন জাম্পা। তবে তৃতীয় বলে বাউন্ডাির হাঁকিয়ে নাটকীয়ভাবে দলের ১ উইকেটের কষ্টার্জিত জয় ও হোয়াইটওয়াশ এড়ানো নিশ্চিত করেন জাম্পা।