
সংসদের সামনে এখন সময়ের চাপ—অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে হবে আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যেই, নইলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরুর পর প্রথম বৈঠকেই এসব অধ্যাদেশ উত্থাপন বাধ্যতামূলক। সেই ধারাবাহিকতায় গত ১২ মার্চ শুরু হওয়া ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে সবগুলো অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়। সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তবে, সংসদ চাইলে আইন হিসেবে পাশ করতে পারে বা বাতিল করতে পারে।’
এই সময়সীমা অনুযায়ী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারিকৃত অধ্যাদেশগুলো নিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংসদকে।
গত ১২ মার্চের অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এসব অধ্যাদেশ উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৫ মার্চের বৈঠকে এগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয় এবং কমিটিকে ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংসদের বিশেষ কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে ১৩৩টির মধ্যে ৪০টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’ বিষয়ে সর্বসম্মত মত পাওয়া গেছে এবং এটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ-২০২৫’ অপরিবর্তিত রাখার পক্ষেও ঐকমত্য হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যেখানে কমিটির অধিকাংশ সদস্য এতে সম্মত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় আজ বুধবার বেলা ২টায় আবারও বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন বলেন, এখনো অর্ধেকের কম অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করা হয়েছে। কিছু বিষয়ে সদস্যদের ভিন্নমত রয়েছে, যা পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কমিটি সংসদে প্রতিবেদন দিতে পারবে।
বৈঠকের মাঝপথে বের হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশ এক বৈঠকে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়, এজন্য একাধিক বৈঠক প্রয়োজন হবে। তিনি জানান, অনেক বিষয়ে ইতোমধ্যে ঐকমত্য হয়েছে এবং ‘জুলাই ইনডেমনিটি’র বিষয়ে সবাই একমত।
বৈঠক শুরুর আগে তিনি আরও বলেন, ‘জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আমরা ধারণ করব। কিছু অধ্যাদেশ আছে যেখানে জুলাই যোদ্ধাদেরকে যেই নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে ও অংশগ্রহণ করেছে তাদের ইনডেমনিটি দেওয়ার বিষয় আছে, সেগুলোকে আমরা গ্রহণ করব। আরো কিছু বিষয়ে আছে। যেমন বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছিল তাদের নেতাদের নামে এবং বিভিন্ন নামে, সেগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে এগুলোকে আমরা গ্রহণ করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরো অনেক অধ্যাদেশ রয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে কোনটা কীভাবে গ্রহণ করা যায়; কোনটা সংশোধনীসহ গ্রহণ করা যায় আবার কোনটাতে পরে আরো সংশোধনী আনতে হবে সেটা সেভাবেই ফয়সালা করতে হবে। সময় সংক্ষিপ্ত। এসব ৩০ দিনের মধ্যে ফয়সালা করার বাধ্যবাধকতা আছে। আমাদের প্রথম অধিবেশন গত ১২ মার্চ বসেছিল। পরবর্তী অধিবেশন আগামী ২৯ মার্চ। এর মধ্যে প্রায় ১৫ দিনের মতো সময় অতিবাহিত হয়ে যাবে। বাকি ১৫ দিনের মধ্যে যা করা যায় ব্যবস্থা করব।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এখনো আলোচনা চলছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই জানা যাবে। সংবিধান ও গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে কী হবে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সংবিধান অবশ্যই সবার থেকে এগিয়ে থাকে।’
অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে তারা একমত। তবে সংবিধান ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই আকাঙ্ক্ষাকে অবশ্যই প্রাধান্য দেবেন। সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়।’
প্রথম বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, প্রবাসীকল্যাণ, পরিবেশ, নারী ও শিশু, বেসামরিক বিমান পরিবহন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে সবগুলো বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
কমিটির এক সদস্য জানান, কিছু অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত এসেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩ থেকে ৩৫ বছর করার প্রস্তাবও উঠেছে, তবে অধিকাংশ সদস্য ৩২ বছর নির্ধারণের পক্ষেই মত দিয়েছেন।