
গাজীপুরের শ্রীপুরে সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দমদমা ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি প্রায় দুই বছর ধরে তালাবদ্ধ পড়ে আছে। উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের দমদমা গ্রামে স্থানীয়দের দান করা জমিতে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতায় এটি এখনো চালু করা হয়নি। একই কারণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দও পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে জনবল নিয়োগও সম্ভব হচ্ছে না। এতে আশপাশের তিন উপজেলার মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা হাসপাতালে এসে ফিরে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে ভবন, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গর্ভবতী মা, প্রসূতি ও নবজাতকের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, পুষ্টির মান উন্নয়ন এবং টিকাদান কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যেই ইউনিয়ন পর্যায়ে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের দমদমা গ্রামে ২০২২ সালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় এমপির সুপারিশ ও অনুরোধে তার বাড়ির পাশেই নির্মাণ করা হয় দমদমা ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র। অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে। সেখানে রোগীর বেড, জেনারেটর, এসি, ফ্যান, চেয়ার-টেবিলসহ প্রয়োজনীয় ও আনুষঙ্গিক আসবাবপত্র স্থাপন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দান করা ৪৩ শতাংশ জমির ওপর ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২৪ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হ্যাভেন এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স রুপালী এন্টারপ্রাইজ হাসপাতালটি স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস ছাত্তার বলেন, ‘আমাদের গ্রামের কয়েকজন মিলে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ৪৩ শতাংশ জমি দান করে। এখানে আধুনিক ভবনসহ সবকিছু করা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত চিকিৎসকের দেখা পেলাম না। কি কারণে চালু হচ্ছে না হাসপাতালটি সেটিও আমাদের বোধগম্য নহে। এখন আমাদেরকে গাজীপুর জেলা শহরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। যা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং ভোগান্তি। এই হাসপাতালটি চালু হলে আমরা সহজে এবং কম খরচে চিকিৎসা সেবা নিতে পারতাম। আমরা চাই সরকার দ্রুত এই হাসপাতালটি চালু করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে।’
দমদমা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘হাসপাতালটি চালু হলে সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ খুব সহজে চিকিৎসা সেবা নিতে পারতো। আমাদের কপাল ভালো না। এত সুন্দর আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হলো, সমস্ত আসবাবপত্র আসলো, ১০ শয্যা হাসপাতালের যা দরকার সব সরঞ্জাম দেওয়া হলো। শুধু অনুমতির অজুহাতে হাসপাতালটি চালু হচ্ছে না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোতাহার হোসেন পালোয়ান বলেন, ‘আমাদের গ্রামের মানুষ বড় আশা নিয়ে এই হাসপাতালটির জন্য জমি দান করছিলেন। কিন্তু তাদের আশায় গুড়ে বালি। এই হাসপাতালটি চালু হলে দমদমা, নলগাও, চিনাশুকানিয়া, দরপাড়া সহ আশপাশের ২০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ হাতের নাগালে চিকিৎসা সেবা পেত। সরকারের কাছে দাবি দ্রুত যেন হাসপাতালটি চালু করার ব্যবস্থা করা হয়।’
হাসপাতালটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা সহকারী নার্সিং এটেন্ডেন্ট জোবাইদা আক্তার রিমা বলেন, ‘তিনি এখানে ডেপুটেশনে রয়েছেন, তবে বিগত দুই বছরের বেশি সময় যাবত তিনি কোন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এক ধরনের মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এত বড় হাসপাতালে একা থাকাকে তিনি অনিরাপদ মনে করছেন।’
গাজীপুর জেলার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শিহাব উদ্দিন জানান, দমদমা গ্রামের ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি নির্মাণে ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুন মাসে পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কমিটির মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবু তাহের মো. সানাউল্লাহ নুরী বলেন, ‘প্রশাসনিক অনুমতি না থাকায় হাসপাতালটি চালু করা যাচ্ছে না। এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে অবহিত করে পত্র পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই হাসপাতালের কার্যক্রম চালু হবে।’