
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনায় সাত সদস্যের একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সক্রিয় ছিল বলে দাবি করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
তিনি বলেছেন, সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো মূলত এই চক্রটিই গ্রহণ করত এবং তারা প্রতি মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনাতে গোপন বৈঠকে বসত। এই প্রভাবশালী চক্রের নানামুখী হস্তক্ষেপ ও মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি নিজের কার্যকাল চলাকালীন তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেও খোলসা করেছেন। তবে সরকারের ভাবমূর্তি ও সম্ভাব্য অস্বস্তির কথা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেননি।
সম্প্রতি দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, “উক্ত কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্যদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা কম থাকলেও সরকারের নীতিনির্ধারণী বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাদের মতামতকেই অতিরিক্ত এবং বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।” নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি যমুনাতে তাদের একটি বৈঠকে একবার গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি প্রতি মঙ্গলবার তারা নিয়মিত বসেন। সরকারের মূল সিদ্ধান্তগুলো পর্দার আড়ালে মাত্র কয়েকজন মিলে নিচ্ছে—এমন কথাবার্তা উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় আমার কানেও আসত।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) বা অদৃশ্য কোনো শক্তির সক্রিয়তা নিয়ে সাবেক এই শীর্ষ কূটনীতিক বলেন, “ডিপ স্টেট পৃথিবীর সব বড় ঘটনার সাথেই যুক্ত থাকে। তারা সাধারণত স্রোতের বিপরীতে যায় না, বরং স্রোতের অনুকূলে ভেসে থেকে নিজেদের সুবিধামতো পরিস্থিতি ম্যানিপুলেট (নিয়ন্ত্রণ) করার চেষ্টা করে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হতো বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তৌহিদ হোসেন। বিশেষ করে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই চুক্তির প্রক্রিয়ার সাথে সামান্যতমও যুক্ত ছিল না। এর সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। যদি আন্তর্জাতিক কোনো বাধ্যবাধকতা না-ই থাকত, তবে এমন একটি স্পর্শকাতর চুক্তি সই করার বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও যথাযথ ছিল।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত চেয়ে দিল্লিতে চিঠি পাঠানোর বিষয়ে তিনি জানান, এই কূটনৈতিক চিঠি যে বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না বা শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা যাবে না, তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। তবে প্রথা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী তাকে এই কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হয়েছিল।
বিগত ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা এবং বর্তমানে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তৌহিদ হোসেনের মূল্যায়ন হলো, “আমি মনে করি আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে একেবারে শেষ হয়ে যাবে না। আমাদের দেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব দীর্ঘ নয়। তাই আমার অনুমান, তারা আগামী নির্বাচনে ঠিকই অংশ নেবে।”
দেশে সদ্য গঠিত নতুন নির্বাচিত সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তবে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপট টেনে তিনি মনে করেন, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং প্রতিবেশী ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় ও প্রধান চ্যালেঞ্জ।