
সরকারি দল, তাদের সহযোগী সংগঠন কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশ ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে সরকার আরও জনআস্থা হারাবে এবং শেষ পর্যন্ত জনরোষের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তবে সরকারি দল এমন কোনো পথে যাবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কর্মসূচির চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা জানাতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, সরকার উৎখাতের আন্দোলন নয়
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে এবং বাইরে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, এই কর্মসূচিও শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবেই অনুষ্ঠিত হবে। সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে বিরোধী দল কোনো আন্দোলন করছে না।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, লংমার্চ সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের সহযোগিতা দেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাও বজায় থাকবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি দল, তাদের সহযোগী সংগঠন বা প্রশাসনের কোনো অংশ যদি লংমার্চের পথে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে সরকার আরও জনসমর্থন হারাতে পারে এবং জনরোষের মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে সরকারি দল এমন কিছু করবে না বলেই তিনি আশা করেন।
শাপলা চত্বর থেকে শুরু, শেষ লালদীঘি ময়দানে
লংমার্চের সময়সূচি তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, শনিবার সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঢাকার শাপলা চত্বরে প্রথম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর লংমার্চের বহর নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পথসভা করবে।
লংমার্চের শেষ সমাবেশ হবে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে।
যানজটসহ পথে অন্য কোনো জটিলতা না থাকলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে লংমার্চের বহর লালদীঘি ময়দানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে পরিস্থিতির কারণে কর্মসূচির সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে এবং সে বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সব নেতা সব পথসভায় বক্তব্য দেবেন না
পথে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যাতে কম হয় এবং পথসভাগুলো দীর্ঘ না হয়, সে জন্য প্রতিটি সভায় ১১ দলের সব নেতা বক্তব্য দেবেন না বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, স্থানীয় শাখাগুলোই সংশ্লিষ্ট এলাকায় পথসভার আয়োজন করবে এবং স্থানীয় নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। তবে লংমার্চের গাড়িবহরে থাকা নেতাকর্মীরা পথসভায় নেমে আসবেন না। যেসব নেতার বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে, কেবল তারাই গাড়ি থেকে নেমে বক্তব্য দেবেন।
লংমার্চ চলাকালে পথে আরও গাড়ি বহরে যুক্ত হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে নতুন করে যুক্ত হওয়া গাড়িগুলো বহরের একেবারে শেষের দিকে রাখা হবে।
নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে
লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ডেলিগেট কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক। বহরে থাকা বাসগুলোতে নির্দিষ্ট স্টিকার থাকবে।
এ ছাড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা, অ্যাম্বুলেন্স, দলের সাংস্কৃতিক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের গাড়ি এবং মেডিকেল টিমের গাড়ি কীভাবে চলবে, সে বিষয়েও পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘সময় পার হয়ে যাওয়া ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেছে’
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সব ধরনের সমস্যার সমাধান করার জন্য ছয় মাস সময় যথেষ্ট নয়। তবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত সময়সীমার যে ‘ট্রেন’, সেটি ইতোমধ্যে স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে।
তিনি বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি ১৮০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু সরকার তা করেনি।
এসব বিষয় বাস্তবায়নে সরকারের আর কত সময় প্রয়োজন, তা সংসদে এসে সরকারকেই জানানো উচিত বলে মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
‘আগের সরকারের তুলনায় পরিস্থিতি কমানো যেত’
দেশ থেকে অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তবে তার দাবি, নৃশংসতা, বর্বরতা, লুটপাট ও দলীয়করণের মাত্রা আগের সরকারের তুলনায় কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল।
কিন্তু সরকার সেই উদ্যোগ না নিয়ে আগের পথেই হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদীরা’ বর্তমানে যে ধরনের আস্ফালন করছে এবং আধিপত্যবাদী শক্তির প্রশ্রয়ে বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করে যেভাবে উসকানি দিচ্ছে, ছয় মাসের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল না।
‘দুষ্কৃতিকারীরাও ভয় পাবে’
লংমার্চ ঘিরে নাশকতা বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এখন পর্যন্ত তারা এ ধরনের কোনো আশঙ্কা করছেন না।
তিনি বলেন, ১১ দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। সবাই একসঙ্গে লংমার্চে অংশ নিলে দুষ্কৃতিকারীরাও ভয় পাবে।
তবে লংমার্চে সামান্যতম বিশৃঙ্খলা বা হামলার ঘটনাও ঘটলে এর দায় সরকারি দলকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। একই সঙ্গে এমন কোনো ঘটনা ঘটলে এর ‘শক্ত জবাব’ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
দুই মন্ত্রীকে নিয়েও পাটওয়ারীর অভিযোগ
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ‘ফ্যামিলি ব্যবসা’ শুরু করেছেন। তার দাবি, এই ব্যবসা আগে গোপালগঞ্জে ছিল, এখন বগুড়ায় শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলের দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক।
লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে আগেই বৈঠক
এর আগে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ ও মোবারক হোসাইন।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলামসহ আরও অনেকে।