
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনতে যেখানে খরচ হচ্ছে ৪ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র ২০ বর্গফুটের মতো একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতেও গুনতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ জীবনের শেষ ঠিকানার এক টুকরো জায়গার দাম অনেক ক্ষেত্রে একটি অভিজাত ফ্ল্যাটের কাছাকাছি।
ঢাকার দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে জনসংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়ছে না কবরস্থানের জমি। ফলে রাজধানীর পুরনো কবরস্থানগুলোয় জায়গার সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে বনানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে কবরের জায়গা তৈরির সুযোগ প্রায় নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরিচালিত বনানী কবরস্থানে প্রতিদিনই কবরের জায়গার খোঁজে আসছেন মানুষ। কেউ পরিবারের সদস্যের জন্য আগাম ব্যবস্থা করতে চান, আবার কেউ নিজের মৃত্যুর পরের ঠিকানা নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু জায়গার সংকটে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতেও প্রস্তুত অনেককে ফিরতে হচ্ছে হতাশ হয়ে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৬৫ বছর বয়সী শহিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে নিজের জন্য কবরের জায়গা খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘৪-৫ কোটি টাকা দিতেও রাজি ছিলাম। তারপরও সাড়ে তিন হাত জায়গার এক টুকরো জমি মিলছে না। মানুষ জীবনে কত কিছু কেনে। কিন্তু শেষ ঠিকানার জন্য একটা ছোট জায়গাও যদি নিশ্চিত করতে না পারে, সেটা কষ্টের।’
কবরস্থানের জায়গার সংকটের কারণে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি স্থায়ী কবর পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে নতুন করে দাফন করতে নির্ধারিত ফি দিতে হয় ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট মেয়াদের ব্যবস্থা। ১৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে খরচ প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
কবরস্থান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বনানী কবরস্থানে বর্তমানে নয় হাজারের বেশি কবর রয়েছে। জায়গার স্বল্পতার কারণে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণত দুই বছর পর একটি কবরের ওপর নতুন করে দাফন করা হয়। কোনো কোনো স্থায়ী কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফনের নজিরও রয়েছে।
কবরস্থানের মহরার দায়িত্বে থাকা হারুনুর রশীদ বলেন, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জন কবরের জায়গা নিতে আসেন। অনেকেই বড় অঙ্কের অর্থ দিতে প্রস্তুত থাকলেও জায়গা না থাকায় তাদের কোনো আশ্বাস দেওয়া সম্ভব হয় না।
শুধু বনানী নয়, রাজধানীর অন্যান্য কবরস্থানেও একই সংকট। প্রায় ৩২ একর জমির ওপর বিস্তৃত আজিমপুর কবরস্থানে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কবর। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের দাফন হয়। জায়গার সংকটের কারণে এখানেও দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা কার্যত সীমিত।
মহরার দায়িত্বে থাকা রবিউল ইসলাম বলেন, দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও জায়গার অভাবে হাজার হাজার আবেদন জমে আছে। সাধারণত একটি মরদেহ প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত কবরে রাখা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী কবরটি পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কবরস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরসেবা। মানুষের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাকে নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার সম্প্রসারণের সঙ্গে কবরস্থানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদাকে সমন্বয় করে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনো গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘কবরস্থান একটা আবেগের জায়গা। প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন এখানে। অন্তত এক-দুই পুরুষ পর্যন্ত কবরস্থান সংরক্ষণ করাটা মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। কোনো উন্নত জাতিই তাদের আবেগকে পিষে ফেলে এগিয়ে যায়নি। আমাদের শহর বড় হচ্ছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কিন্তু আমাদের আবেগের জায়গাগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।’
তিনি বলেন, ঢাকায় ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে দেড় কোটি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এত উচ্চ ফি কবরস্থান সংকটের তীব্রতাই তুলে ধরে। তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কবরস্থানকে কমিউনিটি স্পেস হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। ইরান ও উজবেকিস্তানে এমন চর্চা রয়েছে। কিন্তু ঢাকায় কবরস্থান নিয়ে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।
প্রপার্টি কেনাবেচার অনলাইন মার্কেটপ্লেসসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বনানীতে দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম অবস্থানভেদে ৪ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা। একই আয়তনের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। বিপরীতে বনানী কবরস্থানে ৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণে খরচ প্রায় ৪ কোটি টাকা। প্রায় ২০ বর্গফুট জায়গার হিসাবে প্রতি বর্গফুট কবরের জায়গার মূল্য দাঁড়ায় ২ কোটি টাকারও বেশি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, ঢাকায় কবরস্থানের সংকট এখনো ততটা তীব্র হয়নি। তার মতে, রাজধানীর অনেক বাসিন্দাই এখনো নিজ গ্রামে স্বজনদের দাফন করতে চান। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঢাকায় দাফনের প্রবণতা বাড়বে। ভিটেমাটি হারিয়ে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারীর সংখ্যাও বাড়ছে।
তিনি বলেন, আগামী ২০ বছরের মধ্যে ঢাকায় দাফনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই রাজধানীতে কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করা জরুরি।
রাজউকের এ নগর পরিকল্পনাবিদ জানান, বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য এক একর কবরস্থান প্রয়োজন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি হলে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৭০০ একর কবরস্থান। আর জনসংখ্যা দুই কোটি ধরলেও প্রয়োজন হবে প্রায় ৪০০ একর জমি। ড্যাপে প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট কবরস্থান নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বনানীর কবরস্থানের চিত্র শুধু জমির অস্বাভাবিক দামের গল্প নয়; এটি দ্রুত বেড়ে ওঠা ঢাকার ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে—জীবনের শেষ ঠিকানার জন্য রাজধানীতে কতটুকু জায়গা থাকবে?