
ভালবাসার টানে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে ভিনধর্মের এক প্রবাসীকে মুঠোফোনে বিয়ে করেছিলেন কলেজপড়ুয়া তরুণী বাণী দারু। তবে সুখের সেই স্বপ্ন স্থায়ী হলো না মাত্র ছয় মাসও। চিরতরে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন ১৯ বছর বয়সী এই নববধূ। নিহতের কপাল, চোখ, মাথা, গলা ও পাসহ শরীরের একাধিক স্থানে গভীর ক্ষত এবং দাঁত ভাঙা থাকায় এটিকে সুপরিক্ষিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করছে তরুণীর পরিবার। অন্যদিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ তড়িঘড়ি দাফন করার অভিযোগ উঠেছে বরের স্বজনদের বিরুদ্ধে, যা নিয়ে ময়মনসিংহ জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
লোমহর্ষক এই ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায়। নিহত বাণি দারু (ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর নাম মারিয়া ইসলাম) উপজেলার আওলাতলী গ্রামের নলুয়াকুড়ি পাড়ার বাসিন্দা জগদীশ ওরফে রঙ্গিলার দ্বিতীয় সন্তান। তিনি হবিরবাড়ি সোনার বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, গত বছরের ২০ ডিসেম্বর হঠাৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন বাণী। এর পরদিনই অর্থাৎ ২১ ডিসেম্বর তিনি আদালতের মাধ্যমে সনাতন ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে মারিয়া ইসলাম রাখেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পরপরই আওলাতলী গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে ও সৌদি আরব প্রবাসী মহসিনের (২২) সাথে মুঠোফোনের মাধ্যমে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে ভিন্ন ধর্মে বিয়ের কারণে মহসিনের পরিবার প্রথম দিকে এই সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। বাধ্য হয়ে মারিয়া উপজেলার হাজির বাজার এলাকার একটি ভাড়া বাসায় একাকী জীবনযাপন শুরু করেন। পরবর্তীতে প্রবাসে থাকা ছেলের উপর্যুপরি অনুরোধে মহসিনের পরিবার এই বিয়ে মেনে নিলেও মারিয়াকে নিজেদের বাড়িতে জায়গা দেননি। তবে প্রায়শই মহসিনের মা তাঁর পুত্রবধূ মারিয়াকে দেখতে ওই ভাড়া বাসায় যেতেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ জুন নববধূ মারিয়া ইসলামকে আশঙ্কাজনক ও মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁর শাশুড়ি প্রথমে ভালুকা সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে ভর্তি না করায় দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর মারিয়াকে চুরখাই কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ৬ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।
মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে মারিয়ার মা শারতি দেবীসহ পরিবারের সদস্যরা প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা মারিয়ার মুখের দাঁত ভাঙা ছাড়াও মাথা, কপাল, চোখ, গলা ও পাসহ শরীরের স্পর্শকাতর বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখতে পান। এই নৃশংসতা দেখে মারিয়ার মা তাৎক্ষণিকভাবে মরদেহের ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) করার জোর দাবি জানালেও বরের পরিবারের লোকজন কোনো তোয়াক্কা না করে তড়িঘড়ি করে লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসে এবং নিজেদের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন করে।
কন্যার এমন রহস্যজনক মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়ে মা শারতি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, তাঁর মেয়েকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। তিনি মেয়ের শরীরের একাধিক স্থানে নির্যাতনের ক্ষত নিজে দেখেছেন। তবে বিচার পাওয়ার আকুতি জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা অন্য ধর্মের লোক এবং অত্যন্ত দরিদ্র। জমিজমা বা অর্থ না থাকায় আইনি লড়াইয়ের খরচ জোগানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই, আর এই আর্থিক অনটনের কারণেই তাঁরা থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা করতে সাহস পাননি।
অন্যদিক পুত্রবধূর গায়ে আঘাতের সব অভিযোগ অস্বীকার করে মহসিনের মা দাবি করেন:
"তার ছেলে সৌদি থাকে। মোবাইলে পাশের গ্রামের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার পর সে বিয়ে করে। যদিও বিয়ের আগে ওই মেয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাই তাদের বিয়ে মেনে নেয়নি তারা। পরে ছেলে বউ হাজির বাজার এলাকায় একটি বাসায় ভাড়ায় থাকতো। কিন্তু ছেলের অনুরোধে বিয়ে মেনে নিতে হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই তার ছেলের স্ত্রী ডায়াবেটিকসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভোগছিলো।অসুস্থাতার খবর পেয়ে তিনি তার পুত্রবধূকে হাসপাতালে নিয়ে যান এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।"
মারিয়ার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে বরের পরিবার দাবি করলেও ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন খ্রিষ্টান মিশনারি সংগঠনের নেত্রী সুফলা চাম্বুগং। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন:
"বাণি অসুস্থ হওয়ার পর আমরা হাসপাতালে গিয়ে দেখি বাণির লাশ হাসপাতালের বাইরে টলিতে পড়ে রয়েছে। বাণির মরদেহের মুখের দাঁত ভাঙ্গা, চোখের নিচে, কপাল গলা ও পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।"
পুরো রহস্যজনক এই মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান:
"মেয়েটি খ্রিষ্টান ছিল, কয়েক মাস পূর্বে পালিয়ে গিয়ে এক মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করেছেন। শুনলাম অসুস্থ হয়ে তিনি হাসপাতালে মারা গেছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কিছু জানানো হয়নি। অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"