
দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে শরীরে বহন করে চলা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি অবশেষে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার বাসিন্দা মন্নাস আলীর (৭৫)। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছোড়া একটি গুলি তার পেটে বিদ্ধ হয়েছিল। অর্থাভাবে এতদিন চিকিৎসা করাতে না পারলেও অবশেষে বিনামূল্যে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলিটি বের করেছেন চিকিৎসকরা।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হানের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল প্রায় ৩০ মিনিটব্যাপী অস্ত্রোপচার করে গুলিটি অপসারণ করেন। মন্নাস আলীর বাড়ি উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের হরিয়াউন্দ গ্রামে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় দুর্গাপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একটি ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। ওই সময় গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা তিন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে মাটিচাপা দিলে এর প্রতিশোধ নিতে আশপাশের গ্রামগুলোতে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। হামলায় অর্ধশতাধিক মানুষকে ঘরে আটকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা এবং নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া একটি গুলি মন্নাস আলীর পেটে বিদ্ধ হয়।
অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে তিনি কখনো অস্ত্রোপচার করাতে পারেননি। ফলে শরীরে গুলি নিয়েই কেটে যায় ৫৫ বছর। সম্প্রতি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এলে চিকিৎসকদের উদ্যোগে তাকে হাসপাতালে এনে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্নাস আলীর ছেলে আবুল হোসেন বলেন, “আমার বাবা সব সময় অসুস্থ থাকতেন। টাকার অভাবে তার চিকিৎসা করাতে পারিনি। বাবাও গুলি বের করতে ভয় পেতেন। সবার সহযোগিতায় আজ তার শরীর থেকে গুলিটি বের করা হয়েছে। সবার কাছে দোয়া চাই।”
পুত্রবধূ হামিদা খাতুন বলেন, “শ্বশুর সব সময় বলতেন, তার শরীরে একটি গুলি রয়েছে। আজ অস্ত্রোপচারের পর নিজের চোখে সেটি দেখলাম। তিনি বলতেন, মৃত্যুর পরও যেন গুলিটি শরীর থেকে বের না করা হয়। আল্লাহর রহমতে জীবিত অবস্থাতেই এটি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।”
দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হান জানান, স্থানীয় বাসিন্দা মোশারফ নামের এক ব্যক্তি মন্নাস আলীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শরীরে গুলি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে চিকিৎসকদের একটি দল সফলভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলিটি অপসারণ করে।
তিনি বলেন, “অর্থাভাবে তিনি এতদিন চিকিৎসা নিতে পারেননি। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া গুলির বিষয়ে থানাকে অবহিত করা হয়েছে। তাকে আরও তিন থেকে চার দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।”