
অসংখ্য উদ্ধার অভিযানে পানির নিচ থেকে নিখোঁজ মানুষকে খুঁজে আনা ছিল তার পেশা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই শীতলক্ষ্যা নদীর গভীর থেকে উদ্ধার করা হলো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ ডুবুরি সাদিকের নিথর মরদেহ। মর্মান্তিক এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে ফায়ার সার্ভিস ও তার পরিবারে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ার ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে জমে থাকা কচুরিপানা অপসারণের কাজ চলাকালে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের তিন সদস্য একটি স্পিডবোটে করে কচুরিপানা পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় বোটের সামনের অংশে অবস্থান করা ডুবুরি সাদিক নদীর ঢেউয়ের ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে যান। এরপরই তিনি নিখোঁজ হন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় আট ঘণ্টার চেষ্টার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে অদূরের কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন তার স্ত্রী সাদিয়া, পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। মর্গের সামনে তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, নদী ফায়ার স্টেশনের জেটির সামনে কচুরিপানা অপসারণের সময় সাদিক পানিতে পড়ে যান। সঙ্গে থাকা সদস্যদের ধারণা, পড়ে যাওয়ার সময় তার মাথায় আঘাত লেগে থাকতে পারে। তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ছিলেন। তাই কোনো আঘাত না পেলে এভাবে নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
২০০১ সালের ১০ অক্টোবর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার কুমরাকান্দি গ্রামে জন্ম সাদিকের। ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। পরের বছর ৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনে পদায়ন পান। অল্প সময়েই সাহসিকতা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার জন্য সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন।
সহকর্মীরা জানান, নদীতে নিখোঁজ ব্যক্তি ও ডুবে যাওয়া মানুষের মরদেহ উদ্ধারের বিভিন্ন অভিযানে তিনি সবসময় সামনের সারিতে থাকতেন। সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের একটি লেকে নিখোঁজ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কর্মদক্ষতা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ গত বছর তিনি ‘সেরা ডুবুরি’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও পদক লাভ করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন সাদিক এবং তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডালপট্টি এলাকায় ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করেছিলেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তার সেই স্বপ্নের ইতি ঘটে।
ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।