ফরিদপুরে স্ত্রীর দায়ের করা পর্নোগ্রাফি আইনের মামলায় মীর ইলিয়াস ওরফে সোহেল (৩৯) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া মীর ইলিয়াস ফরিদপুর পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাফুরা এলাকার বাসিন্দা এবং মীর আলমগীরের ছেলে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গিয়াস উদ্দিন সরদার। তিনি জানান, গত ২৭ জুলাই রাতে বোয়ালমারী উপজেলার কালিনগর গ্রামে তার কর্মস্থল থেকে মীর ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে গ্রেপ্তারের পর ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ভিন্ন অভিযোগ তুলেছে অভিযুক্তের পরিবার। তাদের দাবি, ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে বিয়ে করতে বাধ্য করার পর থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল। স্ত্রীর পরিবারের দাবি করা অর্থ না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে এই মামলায় তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
মামলার বাদী তমা আক্তার (৩০) ফরিদপুরের গেরদা গ্রামের বাসিন্দা তৌফিক মীরের মেয়ে এবং তিনি মীর ইলিয়াসের দ্বিতীয় স্ত্রী।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল অভিযুক্ত তার স্ত্রীর কাছে ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এ ঘটনায় ওই দিনই সদরপুর থানায় একটি যৌতুক মামলা করা হয়। এরপর সেই মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয় এবং দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, মামলা প্রত্যাহার না করায় অভিযুক্ত তার ব্যবহৃত একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টসহ তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকে ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেন এবং বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ দাবি করেন।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির স্বজন ও স্থানীয়দের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, বাদী এর আগে দুটি বিয়ে করেছিলেন। দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে থাকা অবস্থায় পারিবারিক বিরোধের কারণে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। এরপর ২০২৪ সালে মীর ইলিয়াসের সঙ্গে তার পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা পরে অনৈতিক সম্পর্কে রূপ নেয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী নিজেই সেই সম্পর্কের ভিডিও মোবাইলে ধারণ করেছিলেন এবং ভিডিওতে সেটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পরে অজ্ঞাত উপায়ে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর মীর ইলিয়াসের প্রথম স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান।
পরিবারের দাবি, পরে কৌশলে মীর ইলিয়াসকে ওই নারীর বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয় এবং স্থানীয়ভাবে একটি সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সালিশে ভিডিওটি উপস্থিত সালিশকারীদের কাছে ওই নারী নিজেই হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৯ মে চার লাখ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাবিননামায় একটি মুচলেকাও যুক্ত করা হয়, যেখানে উল্লেখ ছিল—স্বামী বা স্ত্রী যে-ই সংসার ছেড়ে চলে যাবে, তাকে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর প্রায় দুই বছর তাদের সংসার চললেও বিভিন্ন সময় পারিবারিক কলহ দেখা দেয়। এর মধ্যে প্রায় তিন মাস আগে ওই নারী সদরপুর থানায় যৌতুক মামলা করেন। সেই মামলায় সম্প্রতি জামিন পাওয়ার পর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ এনে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে নতুন মামলা দায়ের করা হয়।
অভিযুক্তের পরিবারের অভিযোগ, ভিডিওকে হাতিয়ার করে ব্ল্যাকমেইল করে এই বিয়ে করানো হয়েছিল। এখন কাবিননামায় উল্লেখিত অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে নানা অপবাদ দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাদের আরও দাবি, অভিযুক্তের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোর পাসওয়ার্ড তার স্ত্রীর কাছেই রয়েছে।
সোহেলের মা তছিরন বেগম অভিযোগ করে বলেন, “দ্বিতীয় স্বামী থাকতেও আমার ছেলেকে ফাঁদে ফেলে নির্যাতন করে বিয়ে করেছে। ওর কারণে আমার প্রথম বউ ও নাতি চলে গেছে। ৭ মাসের একটি বাচ্চাসহ বিয়ে করে আনতে বাধ্য হয়৷ তারপরও আমরা সব মেনে নিয়েছি কিন্তু বিভিন্ন সময় ওর পরিবার আমাদের ভয়ভীতি দেখায় এবং পুলিশ দিয়ে হয়রানি করেছে। বর্তমানে অপবাদ দিয়ে আমার ছেলেকে জেলে পাঠিয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা পাব কোথায়। আমরা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠ তদন্তের দাবি জানাই এবং প্রকৃত দোষীর শাস্তি চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, “যা বলার থানায় বলা হয়েছে।” এছাড়া এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন সরদার জানান, স্ত্রীর দায়ের করা পর্নোগ্রাফি আইনের মামলার ভিত্তিতে মীর ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তার একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। মোবাইলটি পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সিআইডির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।