
তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কুড়িগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় গরুর খামার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা। অসুস্থ মানুষ ও শিশুরা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। একই সঙ্গে বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা ও ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ীরা।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেলি ইউনিয়নের সুরির ডারা গ্রামের খামারি আনিছুর রহমান বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলেন, ‘বিদ্যুৎ নেই। পরিস্থিতি একেবারে খারাপ। খামার নিয়া খুব টেনশনে আছি। গরমে গরু সমানে হাঁপাইতেছে। নেলপা (লালা) ফেলাইতেছে। গোসল ঠিকমতো করে দিতে পারতেছি না, ফ্যানও চালাইতে পারতেছি না। পরিস্থিতি খুব খারাপ। সারা দিনে কারেন্ট এক ঘণ্টাও পাই না। রাইতে অবস্থা আরও খারাপ।’
আনিছুর রহমানের খামারে ৪টি দুধের গাভিসহ ফ্রিজিয়ান ও ক্রোস জাতের মোট ১১টি গরু রয়েছে। তীব্র গরমে গরুগুলোর খাবার গ্রহণ কমে যাওয়ায় দুধ উৎপাদনও কমে গেছে বলে জানান তিনি।
আনিছুর বলেন, ‘গরমে গরু খাইতে পারতেছে না। দিন-রাত হাঁপাইতেছে। গাভিগুলার দুধ কমে গেছে। খেতে না পারলে দুধ কেমন করি হবে। যে গরম পড়ছে, কখন হিট স্ট্রোক হয় সেই চিন্তায় স্থির থাকতে পারি না।’
শুধু আনিছুর রহমান নন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই ক্ষোভ ও বিরক্তি বাড়ছে। উলিপুরের বাসিন্দা ও যুব উদ্যোক্তা মারুফ আহমেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, ‘তীব্র গরমে সারা দিন ছোটাছুটির পর রাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। ৩-৪ ঘণ্টাও ঠিকভাবে ঘুমাতে পারি না। এদিকে এমন শারীরিক অবস্থা, একদিন না ঘুমাতে পারলে পরের দিন প্রেশার হাই থাকে।’
রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘বাচ্চা নিয়ে রাতে পর রাত জাগা কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছে না। পাগল হয়ে যাচ্ছি।’
বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার উৎপাদন কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকেরা সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়ছেন।
কুড়িগ্রাম শহরের পাওয়ারহাউজপাড়া এলাকার ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী সুমন বলেন, ‘সারা দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলে। ৩-৪ ঘণ্টা কারেন্ট পাই। কীভাবে ব্যবসা করি। দিন গেলে লেবারদের টাকা দেওয়া লাগে। কাজের অর্ডার নিয়ে সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারতেছি না।’
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, কুড়িগ্রামে পল্লী বিদ্যুতের আওতায় প্রায় ৫ লাখ এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির আওতায় ৩২ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। জেলায় প্রায় ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সর্বোচ্চ ৪৩ মেগাওয়াট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
নেসকো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে সাড়ে ১১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট। কখনো কখনো ঢাকা থেকে স্ক্যাডা পরিচালনার কারণে বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘাটতির কারণে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’
কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শামীম পারভেজ বলেন, ‘গ্রাহকেরা ক্ষোভ জানাচ্ছেন। কিন্তু কুড়িগ্রামে বরাদ্দ একবারে কম। এর মধ্যে স্ক্যাডা অপারেশন করে ঢাকা থেকে গ্রিড অফ করে দেওয়া হয়। দিনে কিছুটা ভালো থাকলেও রাতে জেলার সব জায়গায় একই অবস্থা থাকে।’