
বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে ফিফার দেওয়া বিশ্বমানের ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটিয়ে কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগরে প্রকল্পটির জন্য ১৫ একর ২০ শতক জমির রেজিস্ট্রি দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কক্সবাজারের তারকা হোটেল লং বিচে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে জমি রেজিস্ট্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) পক্ষে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এবং সরকারের পক্ষে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান সংশ্লিষ্ট নথিতে স্বাক্ষর করেন। পরে জেলা প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে জমির দলিলপত্র বাফুফে সভাপতির কাছে তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় রামু উপজেলায় বাফুফের টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের জন্য সাড়ে ১৫ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি বাফুফের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিও ধন্যবাদ জানান বাফুফে সভাপতি।
তাবিথ আউয়াল বলেন, রামুতে আন্তর্জাতিকমানের ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার গড়ে উঠলে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান ফুটবলাররা এখানে আধুনিক ও পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।
বাফুফে সভাপতি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই টেকনিক্যাল সেন্টার বাংলাদেশের ফুটবলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তার ভাষ্য, রামুর এই কেন্দ্রকে ঘিরে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের তরুণ ফুটবলারদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রামুর রশিদনগরে উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন পার্ক ‘স্বপ্নতরী বিনোদন কেন্দ্র’-এর পাশে মহাসড়কসংলগ্ন সাড়ে ১৫ একর জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর জন্য ফিফার দেওয়া ৮৮ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে বাফুফে।
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল জানিয়েছেন, আগামী মাসেই টেকনিক্যাল সেন্টারের মূল এলাকার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
জমি হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর বাফুফে সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।
প্রকল্পে থাকছে যেসব সুবিধা
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর নিয়মিত অনুশীলন, কোচিং শিক্ষা এবং ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট কার্যক্রমকে একই অবকাঠামোর আওতায় আনাই এই টেকনিক্যাল সেন্টার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য।
আধুনিক বিভিন্ন সুবিধাসম্পন্ন এই কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানের একাধিক প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ঘাসের ফুটবল মাঠ থাকবে। পাশাপাশি থাকবে জিমনেশিয়াম, চারতলা আবাসিক ভবন, ক্লাসরুম ও স্পোর্টস সায়েন্স সুবিধা।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় থাকবে ইনডোর ট্রেনিং সুবিধা, স্পোর্টস সায়েন্স ও মেডিকেল ইউনিট, ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, ভিডিও অ্যানালাইসিস ল্যাব এবং কোচিং এডুকেশন সেন্টার। ডাইনিং ও কনফারেন্স সুবিধার পাশাপাশি বয়সভিত্তিক দলগুলোর জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থাও থাকবে।
এই কেন্দ্র থেকেই ভবিষ্যতে জাতীয় দল, নারী দল এবং অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-২৩সহ সব বয়সভিত্তিক দলের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
নির্ভরতা কমবে বিদেশে প্রশিক্ষণের
বাফুফে কর্মকর্তাদের মতে, টেকনিক্যাল সেন্টারটি চালু হলে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের স্থায়ী ফুটবল প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে উঠবে।
এর ফলে বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরতা কমবে। খেলোয়াড়দের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কোচ ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও আরও উন্নত হবে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সুযোগও তৈরি হবে। কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ফুটবল নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
এই সুযোগ শুধু জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কক্সবাজারের কিশোর ও তরুণদের জন্যও এর মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে।
কক্সবাজার হতে পারে জাতীয় ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু কক্সবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নের ভিত্তিই আরও শক্তিশালী হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই টেকনিক্যাল সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন তারা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার জাতীয় ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
২০২২ সালে ফিফার বরাদ্দ
বাফুফের দাপ্তরিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২২ সালে ফিফার নির্বাহী কমিটি বাংলাদেশের জন্য এই ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার বরাদ্দ দেয়। একই সময়ে কাজ শুরুর নির্দেশনাও দেওয়া হয় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পক্ষ থেকে।
ফিফার নির্দেশনার পর টেকনিক্যাল সেন্টারের জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজতে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সমীক্ষা চালায় বাফুফে। সমীক্ষা শেষে সার্বিক উপযোগিতা বিবেচনায় কক্সবাজারকে প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা হয়।
বাফুফের প্রকল্প কর্মকর্তা তানভির আহমেদ ছিদ্দিকী জানান, কক্সবাজারকে বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভৌগোলিক সুবিধা, প্রশস্ত জায়গা এবং ভবিষ্যতে জায়গাটিকে আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা। মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধাও পাওয়া যাবে।
তিনি জানান, এর অংশ হিসেবে ২০২২ সালেই কক্সবাজারে জমি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে রামু উপজেলার খুনিয়াপালংয়ে একটি জমি নির্বাচন করা হয়েছিল।
ওই বছরের জুলাইয়ে রামুর খুনিয়াপালংয়ে ২০ একর জমি বাফুফের অনুকূলে হস্তান্তর করে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কারণে বাতিল হয় প্রথম জমি
তানভির আহমেদ ছিদ্দিকী আরও জানান, ওই জমিতে টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের প্রস্তুতি হিসেবে বাফুফে ফিফার কাছে এনভায়রনমেন্ট সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস রিপোর্ট পাঠায়।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ জানায়, নির্ধারিত স্থানটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতাভুক্ত। সেখানে নির্মাণকাজ করা হলে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তি এবং পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সুপারিশের পর ওই জমি বাতিল করা হয়। এরপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বাফুফেকে বিকল্প স্থানে টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব দেয়।
কিন্তু এরপর বিভিন্নভাবে জমি খোঁজা হলেও উপযুক্ত জায়গা পাওয়া যায়নি।
তিন বছর পর রশিদনগরে নতুন জমি চূড়ান্ত
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তিন বছর পরে ২০২৫ সালে রামুর রশিদনগরের ধলিরছড়া মৌজায় খাস শ্রেণির ১৫ দশমিক ২০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়।
জমি নির্ধারণের পর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে গঠিত কমিটি বাফুফের নামে বন্দোবস্তমূলকভাবে ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের জন্য জমিটি বরাদ্দ করে। টোকেন মূল্যে বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
বাফুফের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলছিল।
প্রকল্পের স্থানীয় লিঁয়াজো কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ জানান, ২০২২ সাল থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়া চলে আসছে। এ সময় বাফুফের শীর্ষ কর্মকর্তারা একাধিকবার কক্সবাজারে এসেছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সুপারিশের পর সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাফুফের একটি উচ্চপর্যায়ের দল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে আসে। ওই পরিদর্শনের পর রশিদনগরের ধলিরছড়ার জমিটি চূড়ান্ত করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) জমির উদ্দীন বলেন, নির্ধারিত জমিটি পাহাড় শ্রেণির নয়। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গাছপালা ও পরিবেশের ক্ষতিরও সম্ভাবনা নেই।
তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তর সার্বিকভাবে সমীক্ষা চালানোর পর ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার স্থাপনের জন্য অনাপত্তিপত্র দিয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, গত বছর (২০২৫) প্রকল্পটির জন্য জমি বরাদ্দের ব্যবস্থা নিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে বাফুফের সঙ্গে সমন্বয় করে জমি নির্ধারণ করা হয়। পরে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর জমির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে।
একাধিকবার বাতিলের ঝুঁকিতে ছিল প্রকল্প
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিলটন বলেন, বাফুফের নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিল।
তিনি বলেন, “ফিফার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে আমরা দফায় দফায় সময় নিয়েছি। এতে একাধিকবার বাতিলের কথাও জানায় ফিফা। বহু অনুরোধ করে একাধিকবার চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে।
কামরুল হাসান হিলটন বলেন, “সুযোগটি হাতছাড়া হলে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে যেতো। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।”