.webp)
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও দেশের জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সোয়া ৯টার দিকে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ৮ দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ’
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের ক্ষমতায় আসার অন্যতম স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তারা বাংলাদেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখার কথা বললেও বাস্তবে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না। দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা বা নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ আদায়ে সরকার কেন সক্ষম হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কেন নিজের জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে পারছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।
তাঁর ভাষায়, এসব পরিস্থিতি থেকেই বোঝা যায়—বিএনপি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়, বরং নিজেদের দলীয় স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যেই সরকারে গেছে।
গণভোটের রায় প্রসঙ্গে
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়েও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, জনগণ গণভোটে ভোট দিয়েছে, কিন্তু সেই ভোটের রায় এখনো কার্যকর করা হয়নি।
এ সময় শহীদ ওসমান হাদী হত্যার বিচার না পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, কয়েকদিন আগে একটি মামলার বিচারের রায় এসেছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় তাদের ক্ষেত্রেই আসছে, যারা দেশে নেই। দেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের কেন মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, তারা দেশে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হতে দেখতে চান।
‘সারাদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট’
দেশের বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে সারাদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকট চলছে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু সেই অঞ্চলের মানুষও এখন সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে পড়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশের সব প্রতিষ্ঠানে নজিরবিহীন দলীয়করণ হয়েছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসের কারণে বাংলাদেশের সব ক্যাম্পাস এবং বিভিন্ন এলাকা অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তাঁর দাবি, বর্তমানে সারাদেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের জননিরাপত্তা নেই।
শিশুদের নিরাপত্তা নেই এবং মা-বোনদেরও নিরাপত্তা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হচ্ছেন—এসব বিষয়ে সংসদে জবাবদিহিতা করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, জবাবদিহিতা চাওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে তাদের দলীয় নেতাকর্মী এবং ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের কোনো নেতাকর্মীর গায়ে হাত তোলা হলে তার পাল্টা আঘাতের জন্য তারা প্রস্তুত আছেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারকেও প্রস্তুত থাকার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ
সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, পুলিশ সংস্কার কমিশন করা হয়নি। গুম আইন করে গুমের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিরোধীদল দমনের উদ্দেশ্যে এসআরবি গঠন করে পুলিশকে আবারও ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাঁর দাবি, এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আর কাউকে স্বৈরাচার হতে দেবে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, কেউ স্বৈরাচার হওয়ার চেষ্টা করলে—আর এই সরকার সেই চেষ্টা করছে—তাহলে রংপুরের মাটি থেকেই প্রথম বিদ্রোহ ও প্রথম বিপ্লবের আহ্বান আসবে, ইনশাআল্লাহ।
রংপুরের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি
১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থীদের সংসদ নির্বাচনে জয়ী করায় রংপুরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে তাদের কাছে ক্ষমাও চান তিনি।
তিনি বলেন, এখন শুনতে হচ্ছে বিরোধীদলে ভোট দেওয়ার কারণে রংপুরবাসী কোনো উন্নয়নের বরাদ্দ পাবে না। দীর্ঘদিন ধরে রংপুরবাসীর সঙ্গে যে বৈষম্য চলে আসছে, বর্তমান সরকারও তা অব্যাহত রাখছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ কারণে ১১ দলীয় ঐক্যের ৮ দফা দাবির একটি দফা হিসেবে রংপুরবাসীর জন্য ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, এটি শুধু কথার কথা নয় কিংবা শুধু দাবি তোলার জন্য দাবি নয়। তারা বাস্তব অর্থেই ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন দেখতে চান।
‘ঐক্যবদ্ধ থাকলে আট দফা আদায় করেই ঘরে ফিরব’
সমাবেশে ৮ দফা দাবি বাংলাদেশকে মুক্তি দিতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, তারা ৮ দফা দাবি নিয়ে মানুষের কাছে এসেছেন। এই ৮ দফাই বাংলাদেশকে মুক্তি দিতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণ তাদের সঙ্গে থাকলে এবং সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে ৮ দফা দাবি আদায় করা সম্ভব হবে। ২০২৪ সালে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল, সেভাবে ঐক্য ধরে রাখতে পারলে তারা ৮ দফা দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরবেন, ইনশাআল্লাহ।