
বিচার ও শিক্ষা বিভাগে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং দলীয়করণের অভিযোগ তুলে বর্তমান বিএনপি সরকারকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তুলনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বিএনপি। সরকার গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে টঙ্গীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৬ সালের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
‘নির্বাচনের পর সমস্যার সমাধান হয়নি, বেড়েছে’
জামায়াত আমির বলেন, দেশে এখনো মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবিচার বেড়েছে। নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দল ভোটের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে সংকট আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালে জামায়াতে ইসলামী ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার। কিন্তু বর্তমান সরকার নতুন করে বৈষম্য তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগের মতো দলীয় প্রভাব, লুটপাট এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধা ভাগাভাগির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও শোষণ ও লুটপাটের চরিত্র বদলায়নি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এক লুটেরার হাত থেকে আরেক লুটেরার হাতে ক্ষমতা গেছে বলে মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় জনগণ জামায়াতে ইসলামীকে ভরসার জায়গা হিসেবে দেখছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রুকনদের নৈতিকতা ও ইসলামী আদর্শ অনুসরণের আহ্বান
দলের রুকনদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে ইসলামী চেতনায় এগিয়ে যেতে হবে। নিজের প্রবৃত্তি, পরিবার ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইসলাম প্রতিষ্ঠায় শুধু শক্তি প্রয়োগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ, নৈতিকতা ও উত্তম আচরণ মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদায় হজের সময় লক্ষাধিক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসুল (সা.) নিজের কর্ম ও নৈতিকতার মাধ্যমে মদিনাসহ বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
সমাজে সুদের কোনো স্থান থাকা উচিত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলামে সুদ সর্বাবস্থায় হারাম।
গাজীপুরকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে স্থানীয় মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে জয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিএনপির পছন্দের ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশে কার্যত দুটি ধারায় সরকার পরিচালিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একদিকে রয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সরকার, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের পছন্দে পরিচালিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান—এমন অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি আরও দাবি করেন, পছন্দের লোকদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বসিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনে লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে জনগণ জামায়াতে ইসলামীর দিকে তাকিয়ে আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব বাধা অতিক্রম করে দেশে কোরআনের বিধান প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করে শফিকুর রহমান বলেন, ইনশাআল্লাহ, শেষ পর্যন্ত তাঁরা এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাবেন।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যারা
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বক্তব্য দেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুর রউফ, মাওলানা শাহজাহান, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, ড. খলিলুর রহমান মাদানি, সাবেক জেলা আমির আবুল হাশেম খান, জেলা আমির ড. জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর নায়েবে আমির খায়রুল হাসান, সেক্রেটারি আ স ম ফারুক এবং জেলা মহিলা সেক্রেটারি আমেনা বেগমসহ স্থানীয় নেতারা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দারসুল কোরআন উপস্থাপন করেন মাওলানা আব্দুল হালিম। পরে দেশীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের শিল্পীরা ইসলামী সংগীত পরিবেশন করেন।