
রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি থেকে পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার পথে তাদের বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে। এর আগে অবরোধকারীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ছয় সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব। পরে নিরাপত্তা দিয়ে পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বেলা আড়াইটায় রাঙামাটি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব জানান, ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের’ ডাকা অবরোধের কারণে পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েছিলেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় তাঁদের খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পথে সাজেক উজো বাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীরা পর্যটকদের গাড়ি আটকে দেন। এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় তাঁদের। এ সময় পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়া হয় বলে জানান পুলিশ সুপার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার একপর্যায়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটক, সরকারি সম্পদ ও মানুষের জানমাল রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পাল্টা গুলি ছুড়তে বাধ্য হন। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। তবে এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে কেউ হতাহত হননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গোলাগুলির পর ওই এলাকার পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
গোলাগুলির খবর অস্বীকার ইউপিডিএফের
সাজেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির বিষয়ে পুলিশ সুপারের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত খবরকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, জেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি ভণ্ডুল করার চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, সেই অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই গুলিবর্ষণের ঘটনা প্রচার করা হচ্ছে।
আধিপত্যের দ্বন্দ্বে তৃতীয় দফায় সড়ক অবরোধ
এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাজেক পর্যটন সড়কে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়। ইউপিডিএফ-নিয়ন্ত্রিত বলে পরিচিত ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন’ এ কর্মসূচি পালন করছে।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর প্রথমবার সড়ক অবরোধ করা হলে প্রশাসনের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ায় ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় অবরোধ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার থেকে চলছে তৃতীয় দফার কর্মসূচি। নিজেদের তিন দফা দাবির বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় আবারও সড়ক অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
সংগঠন দুটির নেতাদের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু) সশস্ত্র সদস্যরা এলাকার বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছেন। তাঁরা সাধারণ মানুষ ও জুমচাষিদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, ফিরেছেন প্রায় তিন হাজার পর্যটক
অবরোধের মধ্যে সাজেক ভ্যালিতে পর্যটন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। বুধবার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফীর সই করা জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছিল।
প্রশাসনের নির্দেশনার পর বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক থেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটক ফিরে যান।
এদিকে জেএসএসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন সংগঠনটির রাঙামাটি জেলা সভাপতি ডা. গঙ্গামানিক চাকমা। তিনি বলেন, এসব ইউপিডিএফের ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার। দীর্ঘদিন ধরে সাজেকে ইউপিডিএফ যে সন্ত্রাসী তৎপরতা ও জনগণের ওপর শোষণ-নিপীড়ন চালাচ্ছে, সেখান থেকে নজর সরাতেই তারা এ কাজ করছে।
বুকিং বাতিল, ক্ষতির মুখে পর্যটন ব্যবসায়ীরা
বারবার সড়ক অবরোধ এবং পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্তে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সাজেক রিসোর্ট কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা ও দপ্তর সম্পাদক জিয়াউল হক জানান, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাতে কটেজগুলোতে শতভাগ বুকিং ছিল। কিন্তু দুই দিনের ভ্রমণে আসা পর্যটকদের এক রাত থাকার পরই ফিরে যেতে হয়েছে।
তাঁরা আরও জানান, ২৫ ও ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন রিসোর্টের অনেক আগাম বুকিং বাতিল হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সড়ক অবরোধের প্রভাব শুধু পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় বাসিন্দারাও দুর্ভোগে পড়েন। অবরোধের কারণে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনা এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার কাজও ব্যাহত হয়।