
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় দুই কিশোরসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ৩১ দিনের মাথায় গত ২০ অক্টোবর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এখন দ্রুত বিচার ও আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির অপেক্ষায় অপ্রতিমের পরিবার।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান। তিনি জানান, মামলার তদন্তে চার আসামির বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
মামলার বাদী ও অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে ফোন করে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে অভিযোগপত্রের বিস্তারিত এখনো তাঁর জানা নেই।
ফিরোজ বলেন, ‘অপ্রতিমকে ঘিরেই আমাদের বাঁচার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন তারা কেড়ে নিয়েছে। আমরা খুনিদের দ্রুত বিচার দেখতে চাই। আশা করব, আদালতে দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।’
মামলাটির দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব আহমেদ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), মো. সিয়াম (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী, দুই কিশোরকে অভিযোগপত্রে শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, তুহিন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান অভিযুক্ত। পরিকল্পনায় সিয়ামও যুক্ত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তিনজনের বিরুদ্ধে। তুহিন ও দুই কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুই কিশোরের প্রকৃত বয়স নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে অপ্রতিমের পরিবার। প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বয়স নির্ধারণের দাবিও জানিয়েছিল তারা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে পরিবার।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, পুলিশ সুপারের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার এবং গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শেষে ৩১ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরের কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। সে কোটবাড়ির বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়।
নিখোঁজ হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তুহিনকে শনাক্ত করার কথা জানায় পুলিশ। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে অন্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশের দাবি। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাসার খাটের তোশকের নিচ থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছিল পুলিশ।
শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির কারণে অভিযোগপত্র দাখিলের পরপরই আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়নি। পুলিশ সূত্র জানায়, ছুটি শেষে রোববার থেকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।