
সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত ও যৌক্তিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী। একই সঙ্গে জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার এবং ন্যায্য ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে নোটিশে।
জনস্বার্থে নোটিশ
জনস্বার্থে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার রেজিস্টার্ড ডাক ও ই-মেইলের মাধ্যমে এই নোটিশ পাঠান।
লিগ্যাল নোটিশে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিবাদী করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিক ও আইনজীবী হিসেবে সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব তাদের রয়েছে। আদালতের কর্মকর্তা হিসেবেও সংবিধান লঙ্ঘন প্রতিরোধে তারা শপথবদ্ধ।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত না হলে বিচার বিভাগের এই পৃথকীকরণ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের বরাদ্দ ২৯১ কোটি
আইনজীবীরা নোটিশে উল্লেখ করেছেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ ছিল ২৭০ কোটি টাকা।
তবে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় সুপ্রিম কোর্টের জন্য এই বরাদ্দ অত্যন্ত সামান্য বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
নোটিশে মাননীয় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে তিনি পুরো বিচার বিভাগকে সবচেয়ে অবহেলিত খাত হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন, সমগ্র বিচার বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ মাত্র ২২০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২৫০০ কোটি টাকা এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৪ হাজার কোটিরও বেশি।
নোটিশে দাবি করা হয়েছে, ১৭ কোটির বেশি মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা পুরো বিচার বিভাগের বরাদ্দ একটি মাত্র সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বরাদ্দের চেয়েও কম। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এটিই রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রতি অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
বরাদ্দের বড় অংশ অধস্তন আদালত ও উন্নয়ন প্রকল্পে
লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়েছে, ২২০০ কোটি টাকার বড় একটি অংশ আইন ও বিচার বিভাগের অধীন অধস্তন আদালতের বেতন-ভাতা, প্রশাসন ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হবে। পাশাপাশি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভবন নির্মাণ এবং ই-জুডিশিয়ারি স্বয়ংক্রিয়করণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও অর্থ ব্যয় করা হবে।
তারপরও মামলাজটের পরিমাণ এবং বিচার বিভাগের সাংবিধানিক গুরুত্বের তুলনায় সামগ্রিকভাবে বরাদ্দকৃত সম্পদের পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই দশকে বাজেটের গড় ০.৪১ শতাংশ
বিচার বিভাগের প্রতি রাষ্ট্রের এই অবহেলা নতুন নয় বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, গত দুই দশকে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
এমনকি কোনো কোনো বছর সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন খাতে কোনো বরাদ্দই রাখা হয়নি। অথচ উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচার বিভাগ রাজস্বও আনে
লিগ্যাল নোটিশে আরও বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের জন্য কোনো বোঝা নয়। বরং কোর্ট ফি, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক, প্রসেস ফি ও জরিমানার মাধ্যমে বিচার বিভাগ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব জমা হয়।
তবে বিচার বিভাগের প্রকৃত মোট রাজস্ব আয়ের পৃথক ও সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, এটিও বিচার বিভাগের প্রতি রাষ্ট্রের অমনোযোগিতার একটি প্রমাণ। এ বিষয়ে পৃথক ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবিও জানানো হয়েছে।
আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি
পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় আইনজীবীদের জন্য প্রয়োজনীয় চেম্বার, বসার জায়গা, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ডিজিটাল ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং লাইব্রেরি সুবিধায় তীব্র সংকট রয়েছে বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
একই কারণে বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষকেও আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত ভিড়, দীর্ঘসূত্রতা এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়েছে, অপর্যাপ্ত বাজেটের সরাসরি প্রভাব হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী মামলাজট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বিচারকের সংখ্যা ও মামলার সংখ্যার মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাত, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব এবং মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বও দেখা দিচ্ছে।
আইনজীবীদের মতে, এসব পরিস্থিতি বিচারপ্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিচারাধীন মামলা ৪৫ লাখের বেশি
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নোটিশে আরও বলা হয়েছে, দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে বর্তমানে ৪৫ লাখ ১০ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, মামলার এই বিপুল চাপ শুধু বিচারিক সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন প্রতিবেদনে এটিকে একটি সামাজিক সংকট হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে জনগণের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমছে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং সামাজিক বৈষম্যও বাড়ছে।