
রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।
সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের জন্য ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সাময়িক হিসাব অনুযায়ী আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ।
যদিও লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি, তবু আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের সংগ্রহ ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে রাজস্ব বেড়েছে ৪০ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা বা প্রায় ১১ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। তিনি জানান, রাজস্ব সংগ্রহের তিনটি প্রধান খাতেই প্রত্যাশার তুলনায় কম আদায় হয়েছে।
খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, আয়কর খাতে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যের ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ। একই পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা থাকা ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) খাতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা বা ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, শুল্ক খাতে ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যের ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। একই সময়ে এনবিআরের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকে গত মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এনবিআরসহ সরকারের মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। তবে বড় ঘাটতির মধ্যেও চলতি অর্থবছরের জন্য এনবিআরের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ভ্যাট-সংক্রান্ত হয়রানি কমানো এবং পুরো ভ্যাট ব্যবস্থা ডিজিটাল করার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে বিভিন্ন সংস্কার ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ভ্যাট নিবন্ধন সহজ করতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ‘ইনস্ট্যান্ট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন’ চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা দ্রুত নিবন্ধন পাচ্ছেন। পাশাপাশি শতভাগ অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কারও সম্পন্ন হয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে এনবিআর নির্ধারিত ইআরপি (ERP) সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক নথি ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণের বিধান চালু করা হয়েছে। এছাড়া ই-চালান ও এ-চালানের মাধ্যমে ঘরে বসেই অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধের আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে।
ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে স্বয়ংক্রিয় ই-ইনভয়েসিং ব্যবস্থা চালু, ইআরপি তথ্য সংগ্রহে এপিআই (API) সংযুক্তকরণ, কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের মধ্যে সমন্বিত ইলেকট্রনিক ডেটা এক্সচেঞ্জ চালু এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তঃকার্যকারিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে ইলেকট্রনিক আন্তর্জাতিক ডেটা এক্সচেঞ্জ সিস্টেম প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে সরকার বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছে। এর আওতায় কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার, কার্টিজ, বিভিন্ন কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, ডেস্কটপ, নোটবুক, নোটপ্যাড, মাউস, র্যাম ও মাদারবোর্ডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে সম্পূর্ণ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ছাড় দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এই ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।