হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিবার্য পরিস্থিতির মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে কাতার এনার্জি। এর ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে এলএনজি পরিবহন এখনো প্রায় বন্ধ। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য প্রয়োজনীয় এলএনজি সংগ্রহ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের সরবরাহে নতুন শঙ্কা
পাকিস্তানের ক্রেতাদের কাতার এনার্জি জানিয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ বাতিল হতে পারে। বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহেও সেপ্টেম্বরের পর পর্যন্ত বিঘ্ন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপের আরও কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের নোটিশ পেয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত দুটি উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করে—দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং খোলাবাজার। কাতার ও ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির চুক্তি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই দেশ থেকেই নিয়মিত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
মাঝে মধ্যে এক বা দুটি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির চেষ্টা করছে। কিন্তু কয়েকটি কার্গো নির্ধারিত সময়ে না আসায় দেশে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
নভেম্বর পর্যন্ত গড়িয়েছে বাতিল হওয়া চালানের সময়
কাতার এনার্জির সর্বশেষ বাতিল করা চালানগুলোর সময়সীমা নভেম্বরের প্রথম ভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করেছে।
কেউ কেউ গ্যাসের পরিবর্তে অন্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্রেতা গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন পুরোপুরি কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইতালির জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর সময়ের মধ্যে নির্ধারিত আরও পাঁচটি এলএনজি চালান কাতার এনার্জি সরবরাহ করতে পারবে না।
কাতার এনার্জির সঙ্গে এডিসনের চুক্তির আওতায় এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত বাতিল হওয়া চালানের সংখ্যা ২৯টি। এসব চালানের মাধ্যমে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির কথা ছিল।
তবে বাতিল হওয়া চালানগুলোর মধ্যে ২১টির বিকল্প ব্যবস্থা করতে পেরেছে এডিসন। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ওই চালানগুলোতে প্রায় ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস ছিল। বিকল্প ব্যবস্থা করার কারণে গ্রাহকদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাসে মাসে বাড়ছে অনিবার্য পরিস্থিতির মেয়াদ
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কাতার এনার্জি প্রথম অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে মার্চে। এরপর পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রতি মাসে এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবো বলেন, রাজনৈতিক সমাধান না হলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিকভাবে এলএনজি রপ্তানি কবে আবার শুরু হবে, সে বিষয়ে কাতার এনার্জি নিশ্চিত করে কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি। এ কারণেই মাসে মাসে অনিবার্য পরিস্থিতির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও কাতার এনার্জি কোনো সাড়া দেয়নি।
কাতারের এলএনজি রপ্তানি প্রায় থেমে গেছে
চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে কাতারের এলএনজি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি চালান রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫০৯টি।
এর ফলে কাতারের গ্যাস বিক্রি থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, অন্যান্য এলএনজি রপ্তানিকারক দেশগুলো ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করার চেষ্টা করছে। অ্যান-সোফি করবোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে এলএনজি সরবরাহ বেড়েছে। গত এক বছরে নতুন যেসব স্থাপনায় উৎপাদন শুরু হয়েছে, সেগুলোও এই সরবরাহ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
এ ছাড়া নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও এলএনজি উৎপাদন বেড়েছে।
বাড়তি উৎপাদনেও পুরো ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না
অন্যান্য দেশ উৎপাদন বাড়ালেও কাতার থেকে না পাওয়া এলএনজির ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এশিয়ার কিছু বাজারে গ্যাসের ব্যবহার কমে গেছে। কোথাও আবার গ্যাসের পরিবর্তে অন্য জ্বালানি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
ইউরোপও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতায় না গিয়ে নিজেদের মজুত থাকা গ্যাস বেশি ব্যবহার করছে।
অ্যান-সোফি করবো বলেন, বাজারে যে পরিমাণ এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত বেশি দাম দিতে সক্ষম ক্রেতারাই পাচ্ছেন। এলএনজির দাম বেশি থাকার পরও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু ক্রেতা এখনো বাজারে সক্রিয় রয়েছে।
তার মতে, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলএনজি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্য দেশগুলোতে উৎপাদন বাড়লেও এর প্রভাবে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের মোট পরিমাণ কমে যেতে পারে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত
বর্তমান এলএনজি সংকটে সব আমদানিকারক দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। একই সময়ে চীনের এলএনজি আমদানিও কমেছে।
অ্যান-সোফি করবোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যেসব দেশ এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং যাদের আমদানির বড় অংশ কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে, তারাই এই সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে।
বিশেষ করে পর্যাপ্ত বিকল্প চালান নিশ্চিত করতে না পারলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল ক্রেতাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত রয়েছে বলে মনে করেন অ্যান-সোফি করবো।
তবে জাপানের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কারণ এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে দেশটি কাতারের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করেছে জাপান। এসব চুক্তির মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাসের দামের সঙ্গে যুক্ত।
নতুন অবকাঠামো এলেও স্বস্তি ফিরতে সময় লাগবে
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় নতুন এলএনজি রপ্তানি অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব অবকাঠামো চালু হলে ধীরে ধীরে কাতারের বাইরে থেকে বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ বাড়তে পারে।
তবে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে আগের মতো স্বস্তিদায়ক ভারসাম্য ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
শুধু হরমুজ প্রণালি খুললেই কি সংকট কাটবে?
ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বব্যাপী এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। কিছু তেলবাহী জাহাজ এখনো এই জলপথ ব্যবহার করছে। কিন্তু এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
এর কারণ, এলএনজি বহনকারী জাহাজগুলো বিশেষায়িত। ফলে দ্রুত বিকল্প জাহাজ সংগ্রহ করা কঠিন। একই সঙ্গে কাতারের গ্যাস রপ্তানির বিকল্প পথও প্রায় নেই বললেই চলে।
ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া কাতার এনার্জির ১২টি এলএনজি উৎপাদন ইউনিটে উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে।
কাতার এনার্জি জানিয়েছে, রাস লাফান এলাকায় হওয়া হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও দুটি উৎপাদন ইউনিট মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
জুনে সীমিতভাবে শুরু হলেও ফের বেড়েছে ঝুঁকি
জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর সীমিত পরিসরে আবার এলএনজি পরিবহন শুরু হয়েছিল। তবে সেই স্বাভাবিকতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
নতুন করে হামলা শুরু হওয়ার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আবারও বেড়ে যায়। ফলে কাতারের এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে।