
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিছক বিনোদনের জন্য তৈরি একটি সাধারণ ভিডিও যে কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে, তা হাড়েন হাড়ে টের পেলেন ভারতীয় স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান যশ ভরদ্বাজ। দুবাইয়ে অবস্থানকালে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করে তৈরি একটি রিল পোস্ট করার অপরাধে দীর্ঘ ৪৭ দিন বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ৫ মে অবশেষে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ।
মুম্বাইয়ের বাসিন্দা যশ ভরদ্বাজ সম্প্রতি নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি আবেগঘন পোস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন। পুরো ঘটনাটিকে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে। ওই সময় যশ দুবাইয়ে অবস্থানকালে গুগল ম্যাপের কিছু ত্রুটি নিয়ে একটি রসাত্মক রিল ভিডিও আপলোড করেছিলেন। সেই কৌতুকপূর্ণ ভিডিওতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে তৈরি হওয়া জিপিএস (GPS) বিভ্রাটের প্রসঙ্গটি রসিকতাচ্ছলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
পরবর্তীতে গত ১৯ মার্চ দুবাইয়ে একটি শো-এর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হঠাৎ দুবাই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যশের কাছে একটি ফোন আসে এবং তাকে অবিলম্বে থানায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
যশ জানান, তিনি বিষয়টিকে সাধারণ ও নিরীহ কৌতুক ভাবলেও দুবাইয়ের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ভিডিওটিকে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে গণ্য করে।
কারাগারের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে যশ বলেন, ‘এটি একটি সাধারণ এবং বোকা ধরনের রিল ছিল—কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টি মোটেও হাসিমুখে নেয়নি। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে আমাকে আটক ও গ্রেফতার করা হয় এবং একটি ডিটেনশন সেন্টারে আমাকে ৪৭ দিন কাটাতে হয়।’
একটি মামুলি ভিডিওর কারণে যে এত বড় আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে, তা কল্পনারও বাইরে ছিল এই কমেডিয়ানের। এই দীর্ঘ বন্দিদশা এবং মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা যশ ও তার পরিবারের ওপর তীব্র শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
তিনি পোস্টে আরও লেখেন, ‘৫ মে ভারতে ফিরে এসেছি। আমার বা আমার পরিবারের জন্য এটি মোটেও সহজ ছিল না—এটি আমাদের শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে এবং কিছুটা হলেও আর্থিকভাবে নিঃশেষ করে দিয়েছে।’
দুবাই থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার বা deport করার আগে এই ভারতীয় তারকাকে প্রায় সাত সপ্তাহ একটি কেন্দ্রীয় ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রাখা হয়েছিল। সেই কারাগারের পরিবেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে যশ বলেন, সেটি ছিল—‘অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন, জনাকীর্ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত।’
নতুন করে শুরুর প্রত্যয়
সব ধাক্কা সামলে মুম্বাইয়ে ফেরার পর যশ আবারও চেনা মঞ্চে মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়েছেন। সহকর্মী ও ভক্তদের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সমর্থন তাকে দ্রুত এই ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করেছে।
নিজের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখন আবার ট্র্যাকে ফিরে এসেছি এবং ভাগ্যবশত আমার পরিবারও ভালো আছে। মুম্বাই আমার প্রতি সদয় ছিল, যার কারণে আমি ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত মঞ্চে ফিরতে পেরেছি।’
আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে যশ জানান, তিনি এখন ভারতের সিলিকন ভ্যালি খ্যাত বেঙ্গালুরুতে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার কথা চিন্তা করছেন; কারণ ১৬ বছর আগে এই শহরেই তার স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান হিসেবে ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অতীত ভুলে তিনি এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী এবং নতুন নতুন পারফরম্যান্স ও সৃজনশীল প্রজেক্টে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে চান।
তবে এই তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে যে, সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে করা ছোটখাটো কৌতুকও আন্তর্জাতিক মহলে কতটা মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে।
উল্লেখ্য, ভারতীয় নাগরিককে আটক ও দেশছাড়া করার এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে দুবাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
সূত্র: এনডিটিভি