
টিকা বা প্রতিষেধক কেবল শিশুদের জন্যই প্রযোজ্য—আমাদের সমাজে প্রচলিত এই চেনা ধারণাটিকে সম্পূর্ণ ভুল ও অপরিপক্ব বলে আখ্যা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেভাবে ছোঁয়াচে বা সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাতে বয়ঃসন্ধি পার হওয়ার পরও প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষেধক নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান যুগের লাগামহীন দূষণ, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং নিত্যনতুন ভাইরাসের আবির্ভাবের ফলে মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে শৈশবে নেওয়া টিকার ওপর সারাজীবন নিশ্চিন্তে ভরসা করা যাচ্ছে না। বড় বয়সেও শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে বুস্টার বা নতুন টিকার প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এই বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, যেকোনো প্রতিষেধকের কার্যকারিতা শরীরে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বজায় থাকে। বর্তমান সময়ে সংক্রামক রোগের যে বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে, তাতে শুধু শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; প্রাপ্তবয়স্কদেরও সুরক্ষার আওতায় আসতে হবে। বিশেষ করে ১৮ বছর বয়স পার হওয়ার পর প্রত্যেক মানুষের নিচের ৫টি টিকা নেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক:
১. টিড্যাপ (Tdap): ধনুষ্টংকার (টিটেনাস), ডিফথেরিয়া এবং হুপিং কাশির মতো মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচতে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ১০ বছর অন্তর অন্তর এই টিকা নেওয়া উচিত।
২. এইচপিভি (HPV) টিকা: হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের এই প্রতিষেধকটি নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসারসহ আরও বেশ কয়েক ধরনের ক্যানসার রুখে দিতে সক্ষম। ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী ও উভয় লিঙ্গের মানুষের জন্যই এই টিকা নেওয়া জরুরি।
৩. হেপাটাইটিস-বি: লিভার সিরোসিস ও লিভারের ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি প্রতিরোধে এই টিকা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। শৈশবে এই কোর্স সম্পন্ন করা থাকলেও ১৮ বছর পার হওয়ার পর পুনরায় চিকিৎসকের পরামর্শে এটি নেওয়া উচিত।
৪. নিউমোকক্কাল টিকা: সাধারণত ৬৫ বছর বয়সের পর নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিসের হাত থেকে বাঁচতে এই প্রতিষেধক দেওয়া হয়। তবে যাদের আগে থেকেই হাঁপানি, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা (সিওপিডি) কিংবা ডায়াবেটিস রয়েছে, তারা ১৮ বছর পার হওয়ার পর ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এটি নিতে পারেন।
৫. টাইফয়েডের টিকা: বর্তমানে টাইফয়েড জ্বরের প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে যাওয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা পেশাগত বা ব্যক্তিগত কারণে নিয়মিত দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করেন, তাদের জন্য এটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা চিরতরে অটুট রাখতে এবং অকাল বার্ধক্য ও জটিল শারীরিক ক্ষতি থেকে বাঁচতে সঠিক সময়ে সঠিক প্রতিষেধক গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। এটি মানবদেহকে দীর্ঘমেয়াদে নানা ঘাতক ব্যাধি থেকে সুরক্ষিত রাখতে ঢাল হিসেবে কাজ করে।