
দেশের প্রধান আকাশপথের প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত কার্গো এলাকায় পুনরায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যদিও এবারের আগুন পূর্বের ধ্বংসযজ্ঞের মতো দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়নি এবং বড় কোনো আর্থিক ক্ষতি ছাড়াই দ্রুত নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছে, তবুও এই স্পর্শকাতর ও অতি-নিরাপত্তাবেষ্টিত জোনে বারবার আগুনের সূত্রপাত হওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ ও বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত শুক্রবার (৫ জুন) রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগের ৯ নম্বর গেটের কাছাকাছি একটি স্থানে হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। সংবাদের পরপরই বিমানবন্দরের নিজস্ব দমকল বাহিনী এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকর্মীরা দ্রুততার সাথে অভিযান শুরু করেন। সম্মিলিত ও তাৎক্ষণিক প্রচেষ্টায় আগুন বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে, যার ফলে এক বিশাল ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মধ্যরাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত। এই সময় বিমানবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দও তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন।
অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানান, মূলত একটি কুরিয়ার কনটেইনারের ভেতর প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। তবে ঠিক কী কারণে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। একটি সুষ্ঠু তদন্তের পরই বিস্তারিত কারণ জানা সম্ভব হবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, "আগুনের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এখানকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেলো, শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো শর্ট সার্কিট হবে কেন। এর আগেও যে অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, সেখানেও তদন্ত রিপোর্টে শর্ট সার্কিট ছিল। তাহলে নিশ্চয়ই গাফিলতি রয়েছে। আমাদের তা স্বীকার করতে হবে।"
দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, "শনিবার সকালে কমিটিকে প্রাথমিক তদন্ত দিতে বলা হয়েছে। এবার কারও গাফিলতির কারণে হয়ে থাকে, তাহলে খুব শক্ত ব্যবস্থা নেবো, যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।"
এদিকে শাহজালালের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় ঘন ঘন আগুন লাগার ঘটনায় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী মহলে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শত শত কোটি টাকার মূল্যবান আমদানি করা পণ্য যেখানে স্তূপীকৃত থাকে, সেখানে এমন বারবার আগুন লাগার ঘটনা বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বন্দর সম্পাদক আব্দুল রাজ্জাক ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘রাত প্রায় ১২টা। বিমানবন্দরের কার্গো এলাকা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় থাকার কথা। এমন একটি সুরক্ষিত স্থানে কীভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।’
তিনি এই স্থানের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে আরও বলেন, ‘এটি সাধারণ কোনো এলাকা নয়। এখানে আমদানি করা শত শত কোটি টাকার পণ্য সংরক্ষিত থাকে। এত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে তা উদ্বেগজনক।’
বারবার ঘটে যাওয়া এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে আব্দুল রাজ্জাক বলেন, ‘আগের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত এখনও শুকায়নি। এরই মধ্যে আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছেন। বারবার এমন ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ।’
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই কার্গো এলাকাতেই এক প্রলয়ংকরী ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের মোট ৩৭টি ইউনিট একযোগে কাজ করতে বাধ্য হয়। এমনকি বাতাসের তীব্রতা ও আগুনের ভয়াবহতা বেশি থাকায় উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবির বিশেষ দল। স্মরণকালের ভয়াবহ ওই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল শত শত কোটি টাকার মূলবান জাতীয় সম্পদ, যার কারণ অনুসন্ধানে পরবর্তীতে দেশি ও বিদেশি একাধিক সংস্থাকে তদন্ত করতে হয়েছিল।