
কাগজে-কলমে পরিবেশ রক্ষার নানা বুলি আওড়ানো হলেও বাস্তবে দেশের প্রতিটি কোণ বিষাক্ত বর্জ্য আর দূষণে জর্জরিত—বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এমনই এক হাড়হিম করা বাস্তবচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মুনীর চৌধুরী। একই সঙ্গে দেশের এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট পরিচালক হিসেবে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করার লব্ধ অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে তিনি লেখেন, ‘দূষণের ক্ষত অনিরাময়যোগ্য হয়ে দেশের প্রতিটি সেক্টরের উৎপাদনশীলতা ধ্বংস করছে। শত শত কারখানায় ইটিপি নেই, ইটিপি বন্ধ। টনে টনে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে, খালে, কৃষিজমিতে। অথচ পরিবেশ আইনের ৭ ধারার প্রয়োগ কখনো হয়নি।’
তিনি তাঁর পোস্টে স্মৃতিচারণ করে জানান, এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে তিনি সেই সময় বহুমাত্রিক ও কঠোর কৌশল অবলম্বন করে এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়েছিলেন। যার একদিকে ছিল দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোটি কোটি টাকা জরিমানা করা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া, পরিবেশ বিনষ্টকারী কলকারখানার ব্যাংক ঋণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং নিয়মতান্ত্রিক ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) তৈরিতে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া; আর অন্য পাশে ছিল দূষণের ভয়াবহ অপরাধে মানুষ, অর্থনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অমোঘ পরিণতি এবং প্রকৃতির অমোঘ বিচারের বাণী শুনিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা।
কাজের নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দূষণকারীদের হুমকি, জীবনের ঝুঁকি এবং ভয়ংকর রাজনৈতিক চাপের মুখেও আমরা বহু কারখানাকে ইটিপি স্থাপন ও পরিচালনায় বাধ্য করেছিলাম। পরবর্তীতে বহু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট ও গ্রিন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল।’
সাবেক এই পরিচালক আরও উল্লেখ করেন, তাঁর মেয়াদে বায়ুদূষণকারী মারাত্মক কার্বন নিঃসরণকারী প্রায় ১১০০টি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়ে সেগুলোর পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড-হফম্যান এবং ভার্টিকাল শ্যাফট পদ্ধতির মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটার সূচনা করা হয়েছিল। তবে তিনি গভীর ক্ষোভের সঙ্গে এই গুরুতর অভিযোগও তোলেন যে, একপর্যায়ে রাজনৈতিক নেতা ও কর্পোরেট প্রভাবশালী মহলের তীব্র চাপের মুখে তাঁকে সেই দায়িত্ব থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে পরিবেশ সুরক্ষার নামে চলা নানামুখী লোকদেখানো কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, ‘পরিবেশকেন্দ্রিক বিদেশ সফরের প্রতিযোগিতা এবং ওয়ার্কশপে মুখরোচক বক্তৃতা, শত শত গবেষণা ও প্রকাশনা… কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রটি অর্থাৎ এনফোর্সমেন্ট ছিল অবহেলিত, উপেক্ষিত।’
দেশের পরিবেশ রক্ষায় বর্তমান সরকারের প্রতি জরুরি ও সুনির্দিষ্ট ৪টি সুপারিশ পেশ করে তিনি বলেন, ‘দূষণ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী এনফোর্সমেন্ট অভিযান শুরু করা হোক। পরিবেশ-বান্ধব যুগোপযোগী পলিসি প্রণীত হোক। দূষণনিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রপাতির আমদানী শুল্ক কমানো হোক এবং পরিবেশ আইন মান্যকারী শিল্পকারখানাগুলোকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হোক, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদান করা হোক।’
আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে মুনীর চৌধুরী জানান, উন্নত সফটওয়্যার ও আইপি ক্যামেরার সাহায্যে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা দেশের সব কারখানার বর্জ্য শোধন বা ইটিপি কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি করা নিশ্চিত করতে হবে। তবে এর পাশাপাশি এক গভীর সত্যের দিকে আঙুল তুলে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যতই আইন-নীতি যুগোপযোগীকরণ বা আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হোক না কেন, দূষণকেন্দ্রিক দুর্নীতির ছিদ্রপথ বের হয়ে যাবে— আমাদের সততার কত অভাব, তা তো পরীক্ষিত।’
পোস্টের শেষাংশে দেশের কোটি মানুষের অন্তরের আকুতি তুলে ধরে এই পরিবেশবিদ লেখেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ দূষণমুক্ত জীবন প্রত্যাশী। গভীর বেদনা নিয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে অভিযোজিত হয়েছে দূষণে আবৃত জীবনে। পরিবেশ নিয়ে সভা-সেমিনারের বাহুল্য, বিদেশ ভ্রমণের প্রতিযোগিতা, আপ্যায়ন ও সম্মানির সংস্কৃতি কমাতে হবে। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে অত্যন্ত সততা, সাহসিকতা, শুদ্ধতা ও সফলতার সাথে।’