
ঠিক সাতাশ বছর আগের এক হারের প্রতিশোধ আর ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা। ১৯৯৯ সালে ভারতের গোয়া শহরের মারগাওয়ের জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে সাফ গোল্ডকাপের ফাইনালে স্বাগতিক ভারতের কাছে ২-০ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দলের। কাকতালীয়ভাবে, দীর্ঘ ১০ বছর পর সাফের ফাইনালে আবারও যখন ভারত ও বাংলাদেশ মুখোমুখি হচ্ছে, তখন রণক্ষেত্রটি সেই একই মাঠ। আজ সন্ধ্যা ৭টায় ট্রফির লড়াইয়ে নামবে দুদল, যা সরাসরি দেখা যাবে টেলিভিশনের পর্দায়।
সেদিন আলফাজ, মিজানুর রহমান ডন কিংবা ইকবাল হোসেনরা যা পারেননি, আজ সেই অধরা স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার নতুন চ্যালেঞ্জ মারিয়া মান্ডা, আফঈদা খন্দকার, সামসুন নাহার, ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা আর তহুরাদের। দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ আজ আটকে থাকবে এই বাঘিনীদের পায়ে।
বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদীরা বরাবরই নারী ফুটবল দলের পাশে থেকেছেন, জুগিয়েছেন অকুণ্ঠ প্রেরণা। একসময় যাদের নিয়ে কোনো প্রত্যাশাই ছিল না, তারাই টানা দুটি সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরেছেন ছাদখোলা বাসের রাজকীয় সংবর্ধনায়। তবে মাঠের বাইরে বাফুফের বর্তমান কমিটির ব্যর্থতাও স্পষ্ট; তারা নারী দলের নূন্যতম প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারেনি, মেটাতে পারেনি সাফ জয়ের পর ঘোষিত আর্থিক পুরস্কারের প্রতিশ্রুতিও।
বিগত দুটি সাফের ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই নেপালকে সেমিফাইনালেই স্তব্ধ করে ফাইনালে উঠেছে মারিয়ারা। তবে ফাইনালে ভারতকে পেলেও গ্রুপ পর্বের স্মৃতি সুখকর নয়; সেখানে এই ভারতের কাছেই ৩-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল দীর্ঘ সাত বছর পর সাফের মঞ্চে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের প্রথম জয়। তবে আজ সেই অতীত ভুলে সম্পূর্ণ নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামতে হবে। ভারতের মাটিতে খেলা, তাই তারা যে একচুলও জমি ছাড়বে না, তা ভালো করেই অনুধাবন করতে পারছেন অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা।
দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে সবচেয়ে বেশি সাফের ট্রফি জয়ের রেকর্ড ভারতের দখলে, যার শেষটি এসেছিল ২০১৯ সালে। ভারতের সেই একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। ফলে আজ ভারতের সামনে যেমন নিজেদের হারানো মুকুট ফিরে পাওয়ার দিন, তেমনি বাংলাদেশের সামনে ইতিহাস গড়ে টানা তৃতীয়বার অর্থাৎ হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। তবে এই কঠিন সমীকরণের মাঝেও বাংলাদেশ দলের ইংলিশ কোচ পিটার জেমস বাটলার এশিয়া কাপের মতো এবারও অনভিজ্ঞ ও তরুণ ফুটবলারদের মাঠে নামিয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। এই কারণে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হলেও নিজের জেদ থেকে সরতে নারাজ; প্রয়োজনে বাংলাদেশে কোচিং করাবেন না, তবুও নিজের দর্শনেই অবিচল থাকবেন। তাঁর এমন একঘেয়েমি স্বভাব দলের ক্ষতি করছে বলে মনে করছেন ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকে।
সমালোচনার জবাবে কোচ পিটার বাটলার নিজের দর্শন তুলে ধরে বলেন, 'একটা গ্লাসে অর্ধেক পানি রয়েছে। এখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে, আপনি গ্লাসটাকে ভরা দেখবেন নাকি খালি দেখবেন।'
তিনি দলের ভেতরের বাস্তবতা স্পষ্ট করে আরও বলেন, 'আমাদের অনেক সমস্যা। কিন্তু দেশের মানুষ রেজাল্ট চায়।'
সেমিফাইনালে নেপালের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর সরাসরি কর্নার থেকে এক অবিশ্বাস্য 'অলিম্পিক গোল' করে বাংলাদেশকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষেও তেমন কোনো জাদুকরী মুহূর্তের প্রত্যাশা করছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইংলিশ কোচ বলেন, 'আমি সব সময় সুপারস্টার নিয়ে কাজ করি না। আগামীতে আরও কিছু ফুটবলার দেখবেন।'
এদিকে গতকাল সকালে গোয়ায় শেষ মুহূর্তের ঘাম ঝরানোর পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত রেখেছে বাংলাদেশ দল। মূল অনুশীলনের পর আলাদাভাবে টাইব্রেকার, নিখুঁত স্পটকিক এবং গোলকিপিংয়ের বিশেষ মহড়াও সেরে রেখেছেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।