
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর তিনি দেশটির অবশিষ্ট নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। স্থানীয় সময় রোববার (১ মার্চ) তিনি এ কথা জানান। এমন সময়ে তিনি এ মন্তব্য করেন যখন ইরানের শহরগুলোতে দ্বিতীয় দিনের ব্যাপক বোমাবর্ষণ চলছে এবং তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ভীতি তৈরি করেছে।
সোমবার লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্যবস্তু করে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। আগের দিন খামেনির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল হিজবুল্লাহ।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি বলেন, বর্তমানে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবে না। আমরা নিজেদের রক্ষা করছি এবং আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সংঘাত শুরু করেনি। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার প্রচেষ্টা চালানোর খবর অস্বীকার করেন।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি শনিবার নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে জানান যে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় শতশত বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তারা একাধিক শহরের বেসামরিক এলাকাগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, বোমাবর্ষণের দ্বিতীয় দিনের পর মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার দক্ষিণের শহর মিনাবের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলায় ১৬৫ জন নিহত হয়েছে।
এর আগে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহতদের মধ্যে খামেনি ছিলেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে শাসন করছিলেন তিনি।
বেশ কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইএ গত কয়েক মাস ধরে খামেনির গতিবিধি অনুসরণ করছিল।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, খামেনি যখন তেহরানে তার কার্যালয়ে শীর্ষ প্রতিরক্ষা সহযোগীদের নিয়ে বৈঠক ডাকেন, তখন সিআইএ ইসরায়েলকে সে তথ্য দেয়, যা হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নেতৃত্বকে অপ্রস্তুত রাখতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একটি কৌশল অবলম্বন করেছিল। অভিযানের দিন সকালে সেনা কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল, তারা যেদন তাদের গাড়িগুলো নিয়মিত জায়গায় পার্ক না করেন, যাতে ইরানের গোয়েন্দারা কিছু বুঝতে না পারে। এমনকি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বাড়িতেই অবস্থান করছেন—এমন ভুল তথ্যও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কর্মকর্তাদের বরাতে চ্যানেলটি জানিয়েছে, হামলার প্রথম ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ৩০ জন উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যা করে।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন যে, প্রথম দুই দিনের বোমা হামলায় ৪৮ জন ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে দাবি করেছেন, ইরানের নয়টি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নৌ সদর দপ্তর ধ্বংস করা হয়েছে।
এবিসি নিউজের সংবাদদাতা জোনাথন কার্ল জানিয়েছেন যে, ইরান শাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিছু সম্ভাব্য প্রার্থী চিহ্নিত করেছিল, কিন্তু তারা সবাই প্রাথমিক হামলাতেই নিহত হয়েছেন।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এ পর্যন্ত ৯ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন এবং স্প্লিন্টারের আঘাতে তিনজন মার্কিন নাগরিক নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। তবে এই হতাহতের ঘটনা কোথায় এবং কীভাবে ঘটেছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সেসব দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। কুয়েত, আবুধাবি এবং দুবাইয়ের বিমানবন্দরগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রবিবার পর্যন্ত সেগুলো বন্ধ ছিল। এর ফলে বৈশ্বিক বিমান চলাচলে বড় ব্যাঘাতের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের ওপর বিমান হামলা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের বেঁচে যাওয়া এবং নবনিযুক্ত নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী।
আটলান্টিক ম্যাগাজিনকে ট্রাম্প বলেন, তারা কথা বলতে চান এবং আমি রাজি হয়েছি। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব। তাদের এটি আরও আগেই করা উচিত ছিল। তারা খুব বেশি দেরি করে ফেলেছে। তবে এই আলোচনা কবে শুরু হবে তা তিনি প্রকাশ করেননি।
ডেইলি মেইলের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত আগামী চার সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। তিনি আরও মার্কিন নাগরিক হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান এবং মার্কিনিদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব ইতোমধ্যে অনুভূত হতে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে ট্যাংকারে হামলার খবরের পর তেলের দাম বেড়ে গেছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে; বর্তমানে প্রায় ১৫০টি ট্যাংকার এই পথ ব্যবহার না করে নোঙর ফেলে অবস্থান করছে। এমএসসি ও মেয়ার্স্ক-এর মতো বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করার সময় বলেছিলেন যে, এটি ইরানি জনগণের জন্য ৪৭ বছরের পুরনো ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার একটি সুযোগ তৈরি করবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরান-ইরাক সীমান্তের মেহরানে ২২ জন সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন। তাদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে ইরানের সীমান্তে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
দেশজুড়ে চলমান বোমা হামলার মধ্যে ইরানিরা আতঙ্ক ও আশাবাদের মিশ্র অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ দীর্ঘদিনের আশঙ্কিত হামলা শুরু হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, আর সরকারবিরোধীরা আশা করছেন যে এতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পথ খুলতে পারে। তবে একইসঙ্গে তাদের আশঙ্কা, এসব হামলায় দেশে বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অভিযোগ করে বলেছেন, ইরানকে ছিন্নভিন্ন করতে চাইছে তারা। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী হস্তক্ষেপ করলে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, খামেনির হত্যাকাণ্ড তাদের সংকল্প দুর্বল করতে পারবে না। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প একটি ‘লাল রেখা অতিক্রম করেছেন’ এবং এর জন্য তাদের মূল্য দিতে হবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, তিনি নিজে, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্যকে নিয়ে গঠিত একটি নেতৃত্ব কাউন্সিল সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করছে। খামেনি কোনো উত্তরসূরি মনোনীত করে যাননি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আশা প্রকাশ করেছেন যে, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি দ্রুত হবে, কারণ দেশটি বর্তমানে মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে একটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দ্য আটলান্টিক-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবে নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ক্ষতির সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, আমাদের অর্থনীতি এখন ইতিহাসের সেরা অবস্থানে রয়েছে। তবে রোববার রয়টার্স-ইপসোস-এর এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র চারজন আমেরিকানের মধ্যে একজন ইরানে এই হামলাকে সমর্থন করছেন।