
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না এবং কীভাবে চালানো যেতে পারে তা নিয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে ইরানি কুর্দি মিলিশিয়ারা। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ মার্চ) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরান-ইরাক সীমান্তবর্তী এলাকায়, ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট একটি অভিযানের জন্য প্রশিক্ষণও নিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যখন ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু আক্রান্ত হচ্ছে, তখন ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলা।
তবে অভিযান চালানোর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং সম্ভাব্য সময়সূচিও নির্ধারিত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। সূত্রগুলো জানায়, কুর্দি গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়েছে। একই সঙ্গে এরবিল ও বাগদাদ উভয় জায়গার ইরাকি নেতারাও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
এছাড়া অস্ত্র সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সহায়তা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে দুটি সূত্র। এই সম্ভাব্য স্থল অভিযান ও সিআইএ’র সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে সিএনএন। অন্যদিকে অ্যাক্সিওস জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সপ্তাহে ইরাকি কুর্দিস্তানের শীর্ষ দুই নেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
তবে রয়টার্স সিআইএ’র সম্পৃক্ততার মাত্রা, অস্ত্র সরবরাহে তাদের ভূমিকা কিংবা কোনো মার্কিন বাহিনী কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানে প্রবেশ করবে কি না—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি গোয়েন্দা সংস্থাটি। হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। একইভাবে কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
কুর্দি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অপরিহার্য
বিশ্লেষকরা বরছৈন, ইরাক থেকে ইরানের ভেতরে কোনো সামরিক অভিযান চালাতে হলে ব্যাপক মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা প্রয়োজন হবে। পেন্টাগনের তথ্যমতে, এরবিলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ঘাঁটি ইতোমধ্যে ইসলামিক স্টেটবিরোধী আন্তর্জাতিক জোটকে সহায়তা দিয়ে আসছে।
ইরাকি কুর্দিস্তানের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইরাক যুদ্ধ এবং আইএসবিরোধী লড়াইয়ের সময়ও তারা একসঙ্গে কাজ করেছে। তবে এসব গোষ্ঠীর আদর্শ ও আনুগত্যের পরিবর্তনের ফলে মাঝে মাঝে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়।
রয়টার্স বলছে, ইরানের ভেতরে লড়াইয়ে ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সাফল্য কতটা হবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, তাদের যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা সমান নয়। সিএনএনকে এক সূত্র জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী কুর্দি সশস্ত্র বাহিনী ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াবে, যাতে দেশের শহরগুলোতে নিরস্ত্র ইরানিদের বিদ্রোহ সহজ হয়।
আঞ্চলিক প্রভাব ও উদ্বেগ
এই ধরনের কুর্দি সশস্ত্র অভ্যুত্থান ইরানের স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এটি দেশটির বেলুচ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উসকে দিতে পারে, যাদের পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে ইসলামাবাদ বেলুচ স্বাধীনতার দিকে কোনো অগ্রযাত্রা মেনে নেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
এদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার দৃঢ় সমর্থক তুরস্ক, দামেস্ক ও কুর্দি বাহিনীর মধ্যে সমঝোতাকে সিরিয়াজুড়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আঙ্কারা আগেই হুমকি দিয়েছিল, যদি উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে না আসে, তবে তারা সামরিক অভিযান চালাবে।
একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সঙ্গে দীর্ঘদিনের শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কাজ করছে তুরস্ক। ফলে নিজেদের সীমান্তের কাছে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেয়ার বিষয়ে তুরস্ক সহানুভূতিশীল হবে- এমন সম্ভাবনা খুবই কম বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।