
উম্ম আল-খায়ের, অধিকৃত পশ্চিম তীর — ৫ বছর বয়সী মাসা হাথালিন সবেমাত্র কথা বলতে শিখেছে। কিন্তু এই বয়সেই তাকে লড়তে হচ্ছে এক অসম যুদ্ধে। কাঁপা কাঁপা গলায় কাঁটাতারের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে সে মিনতি করছিল, “আমি মাসা। আমাদের রাস্তাটা খুলে দিন। আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি, আমাদের সাথে শুধু বই আছে। আমরা স্কুলে যেতে চাই।”
রবিবার সকালে মাসার মতো আরও কয়েক ডজন শিশু পিঠে স্কুলব্যাগ নিয়ে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছিল। পশ্চিম তীরের উম্ম আল-খায়ের গ্রামের বেদুইন শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কয়েক দশকের পুরনো পথটি এখন কাঁটাতারে অবরুদ্ধ। অপর পাশে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি সৈন্যরা। শিশুদের হাতে থাকা পোস্টারে বড় বড় করে লেখা— “রাস্তা খুলে দাও!”
৪০ দিনের স্তব্ধতা শেষে নতুন বাধা
ইরান ও ইসরায়েল সংঘাতের উত্তাপে ৪০ দিনেরও বেশি সময় ফিলিস্তিনি স্কুলগুলো বন্ধ ছিল। গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির পর স্কুল খোলার অনুমতি মিললেও আনন্দ টেকেনি উম্ম আল-খায়েরের শিশুদের। তারা দেখল, মাত্র এক কিলোমিটার দূরে তাদের স্কুলে যাওয়ার পথটি এখন কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দি।

গ্রাম পরিষদের প্রধান খলিল হাথালিন জানান, শিশুরা যখন এই বেড়া এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন ৫ বছর বয়সী শিশুদের ওপরও সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়েছে। আতঙ্কে অনেক শিশু রাতে ঘুমাতে পারছে না, কেউ কেউ ভয়ে আর ওই পথে যেতেই চাইছে না।
নেপথ্যে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রাতের আঁধারে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা এই বেড়া তৈরি করেছে। আইনি বৈধতা না থাকলেও সৈন্যরা এই বাধা সরাতে দিচ্ছে না। উল্টো বেড়ার ওপর পাথর দিয়ে একটি বড় ‘ডেভিড তারকা’ বানিয়ে রাখা হয়েছে, যেন শিশুদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়—এ ভূমি এখন আর তাদের নয়।
বিপজ্জনক বিকল্প হিসেবে ৩ কিলোমিটার লম্বা একটি পথ প্রস্তাব করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গ্রামবাসীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ সেই পথটি গেছে উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের চৌকির ভেতর দিয়ে, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা একদমই নেই। গত গ্রীষ্মেই এই এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন আওদাহ হাথালিন। এমনকি গত মাসে ৫ বছরের এক শিশু বসতি স্থাপনকারীর গাড়ির ধাক্কায় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে।
‘উম্ম আল-খায়ের ফ্রিডম স্কুল’: সংগ্রামের এক নতুন নাম

স্কুলে যেতে না পেরে দমে যায়নি শিশুরা। তারা শুরু করেছে ‘উম্ম আল-খায়ের ফ্রিডম স্কুল’ নামের এক ব্যতিক্রমী আন্দোলন। সকাল ৭টায় অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে তারা বেড়ার সামনে হাজির হয়। ঢোল বাজিয়ে গান গেয়ে তারা প্রতিবাদ জানায়। মাঝে মাঝে কাঁটাতারের পাশে পাথরের ওপর বসেই বই খুলে পড়তে শুরু করে।
চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষক তারেক হাথালিন বলেন, “এই শিশুরা ৫০ দিনেরও বেশি সময় পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত। তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
১০ বছর বয়সী মীরা বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। তার সরল প্রশ্ন, “পৃথিবীর অন্য সব শিশু স্কুলে যেতে পারলে আমাদের কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে?” আবার ১৩ বছরের সারা সৈন্যদের দেখে ভয়ে কেঁদে ফেললেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়। সে বড় হয়ে আইনজীবী হতে চায়, যেন ফিলিস্তিনিদের অধিকারের জন্য লড়তে পারে।
টিকে থাকার লড়াই
গ্রাম প্রধান খলিল হাথালিন এই অবরোধকে দেখছেন গ্রাম থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, “যতক্ষণ রাস্তা না খুলবে, আমরা প্রতিদিন এখানে বিক্ষোভ করব। খোলা আকাশের নিচে রোদে পুড়েই চলবে শিশুদের পাঠদান। আমরা চুপ করে থাকলে কেউ আমাদের কথা শুনবে না।”

বিক্ষোভ শেষে ফেরার আগে শিশুরা তাদের হাতে আঁকা প্ল্যাকার্ডগুলো কাঁটাতারের ওপর গেঁথে দিয়ে আসে। সেখানে লেখা ছিল: “আমরা পড়তে চাই, আমাদের শিখতে দাও!”
সূত্র: আল জাজিরা