
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের আকাশে ড্রোনের পাখা মেলা এখন থেকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। আকাশপথের নিরাপত্তা সুসংহত করতে ড্রোন কেনাবেচা ও ব্যবহারের ওপর নজিরবিহীন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে চীন সরকার।
আজ শুক্রবার (১ মে) থেকেই এই নতুন আইন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।
নিবন্ধনের কড়াকড়ি ও নতুন নিয়ম
নতুন এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, বেইজিং শহরে এখন থেকে ড্রোন বা এর কোনো যন্ত্রাংশ বিক্রয়, ভাড়ায় প্রদান কিংবা শহরের বাইরে থেকে ড্রোন নিয়ে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রত্যেক ড্রোন মালিকের জন্য তাদের ডিভাইসটি পুলিশের কাছে নিবন্ধন করা এখন বাধ্যতামূলক।
গৃহের বাইরে বা উন্মুক্ত স্থানে ড্রোন ওড়াতে চাইলে ব্যবহারকারীকে অবশ্যই প্রশাসনের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে। শুধু তাই নয়, ড্রোন চালনার যোগ্যতা অর্জনে অনলাইনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট আইন বিষয়ক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াও এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বনাম অর্থনৈতিক লক্ষ্য
চীন সরকার ড্রোন এবং ‘ফ্লাইং ট্যাক্সি’ প্রযুক্তিকে তাদের ‘লো-অল্টিটিউড ইকোনমি’ বা নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতির একটি কৌশলগত অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাত থেকে দুই ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ২৯০ বিলিয়ন ডলার) উপার্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে দেশটি। চীনের অন্যান্য শহরে কৃষিকাজ, পণ্য সরবরাহ কিংবা পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও, রাজধানীর ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বজায় রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে প্রশাসন।
পরিবহন ও মেরামতে বিশেষ বিধি
নতুন আইনের প্রয়োগ এতটাই কঠোর যে, বেইজিংয়ে ড্রোন প্রবেশ করানো বা বের করার সময় নিবন্ধনের প্রমাণপত্র প্রদর্শন করতে হবে। এমনকি কোনো ড্রোন মেরামতের প্রয়োজনে শহরের বাইরে পাঠাতে হলে, তা আর কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো যাবে না; মালিককে সশরীরে উপস্থিত হয়ে তা সংগ্রহ করতে হবে।
বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়
তবে সব ক্ষেত্রেই যে দুয়ার বন্ধ, তা নয়। সন্ত্রাসবাদ দমন, জরুরি উদ্ধার অভিযান এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো স্পর্শকাতর প্রয়োজনে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে ড্রোন কেনা বা মজুত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সাধারণ নাগরিক বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
কেন এই কঠোর অবস্থান?
গত মার্চ মাসে অনুমোদিত এই আইনের লক্ষ্য হলো আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে বেইজিং মিউনিসিপ্যাল পিপলস কংগ্রেসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শিয়ং জিংহুয়া জানান, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা।’
উল্লেখ্য, গত বছর থেকেই বেইজিংয়ের পুরো আকাশসীমাকে ‘নো-ড্রোন জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যেখানে এয়ার ট্রাফিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ ছিল।
বাজার ও শিল্পে প্রভাব
বিশ্বের বৃহত্তম ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডিজেআই (DJI)-এর আদি নিবাস চীনে এবং বর্তমানে দেশটিতে নিবন্ধিত ড্রোনের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। সরকারের এই আকস্মিক ও ব্যাপক বিধিনিষেধে চীনের বিশাল ড্রোন বাজারে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই বেইজিংয়ের ডিজেআই শোরুমগুলো থেকে পণ্য সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে, যা প্রযুক্তিপ্রেমী ও ব্যবসায়িক খাতে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।