
ইউরোপের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এবং ‘পলিটিকো’-এর অন্যতম মালিক মাথিয়াস ডফনারের একটি মন্তব্য সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি নিজেকে একজন ‘গয়’ (ইহুদি ধর্মাবলম্বী নয় এমন ব্যক্তি) হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেছেন যে, ইউরোপের অস্তিত্ব ও মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থেই মহাদেশটিকে ‘আরও বেশি ইহুদি’ হয়ে উঠতে হবে।
মন্তব্যের প্রেক্ষাপট ও মূল সুর
জার্মান সংবাদমাধ্যম জায়ান্ট ‘এক্সেল স্প্রিঙ্গার’-এর প্রধান নির্বাহী মাথিয়াস ডফনার এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন ইউরোপজুড়ে ধর্মীয় পরিচয়, অভিবাসন এবং ইহুদি-বিদ্বেষ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে। ডফনারের মতে, ইউরোপীয় সভ্যতার ভিত্তি মূলত ‘জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান’ বা ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি মনে করেন, এই মূল্যবোধগুলো বর্তমানের বহুমুখী সংকটের মুখে হুমকির মুখে রয়েছে এবং তা পুনরুদ্ধারের একমাত্র উপায় হলো ইহুদি আদর্শ ও ঐতিহ্যকে আরও দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করা।
ইউরোপীয় আত্মপরিচয় নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডফনার বার্লিনে একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় এই বিতর্কিত তত্ত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউরোপ যদি তার গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং উদারপন্থী চেতনা ধরে রাখতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই সেই শিকড়ে ফিরে যেতে হবে যা ইহুদি ধর্মতত্ত্ব থেকে উদ্ভূত। তাঁর ভাষায়, ইউরোপে ইহুদি সংস্কৃতির বিকাশ কেবল ইহুদিদের জন্য নয়, বরং পুরো ইউরোপের স্থিতিশীলতার জন্যই জরুরি। তিনি আরও যোগ করেন যে, ইহুদিদের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধিই হলো ইউরোপীয় সভ্যতার স্বাস্থ্যের আসল মাপকাঠি।
সমালোচনার মুখে ডফনার
ডফনারের এই বক্তব্য কেবল প্রশংসাই কুড়ায়নি, বরং ব্যাপক সমালোচনারও শিকার হয়েছে। সমালোচকদের মতে:
১. একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি: অনেকে মনে করছেন, ডফনারের এই ‘আরও বেশি ইহুদি হওয়ার’ আহ্বান ইউরোপের আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ এবং বহুত্ববাদী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২. গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন: যেহেতু তিনি দ্য টেলিগ্রাফ ও পলিটিকোর মতো প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিকানায় রয়েছেন, তাই তাঁর এই ব্যক্তিগত ও আদর্শিক অবস্থান সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৩. বিভেদ তৈরির আশঙ্কা: কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই ধরনের মন্তব্য ইউরোপের অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করতে পারে।
ইসরায়েল ও জায়নবাদ প্রসঙ্গে অবস্থান
ডফনার দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য একটি নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, এক্সেল স্প্রিঙ্গারের প্রতিটি প্রকাশনাকে অবশ্যই ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার এবং ট্রান্স-আটলান্টিক মৈত্রীকে সমর্থন করতে হবে। তাঁর এই নতুন মন্তব্য মূলত সেই দীর্ঘমেয়াদী আদর্শিক অবস্থানেরই একটি বর্ধিত রূপ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির মূল নির্যাস হলো—মাথিয়াস ডফনার বিশ্বাস করেন ইউরোপ তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলছে। তিনি মনে করেন, ইউরোপকে যদি তার অন্ধকার অতীত (যেমন হলোকাস্ট) থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়, তবে তাকে কেবল সহনশীল হলে চলবে না, বরং ইহুদি চিন্তা ও মূল্যবোধকে সক্রিয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে। তবে তাঁর এই ‘সাংস্কৃতিক প্রেসক্রিপশন’ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে কতটুকু বাস্তবসম্মত বা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েই গেল।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই (Middle East Eye)