
চিকিৎসা গবেষণায় অগ্রগতির লক্ষ্যে মানুষ যখন মৃত্যুর পর নিজের শরীর দান করেন, তখন তাঁরা আশা করেন যে তাঁদের এই ত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাণ রক্ষায় কাজে লাগবে। কিন্তু সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের দান করা এসব মৃতদেহ তাঁদের অজান্তেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতিকতা এবং মানবিক মর্যাদাকে এক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
যেভাবে শুরু হলো এই বিতর্ক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু 'বডি ব্রোকার' বা মৃতদেহ কেনাবেচার মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের আবেগ ও সেবামূলক মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে মৃতদেহ সংগ্রহ করে। অনেক পরিবার বিশ্বাস করে যে তাঁদের প্রিয়জনের দেহ ক্যানসার বা আলঝেইমারের মতো রোগের গবেষণায় ব্যবহৃত হবে। কিন্তু নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব মৃতদেহের একটি বড় অংশ উচ্চমূল্যে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
সামরিক প্রশিক্ষণে মৃতদেহের ব্যবহার
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এসব মৃতদেহ ব্যবহার করছে মূলত তাদের যুদ্ধকালীন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের জন্য। বিশেষ করে কামানের গোলা বা বুলেটের আঘাতে শরীরের যে ধরণের ক্ষত তৈরি হয়, তা নিরাময়ের অনুশীলনের জন্য মানুষের বাস্তব টিস্যু ও অঙ্গের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় দাতাদের বা তাঁদের পরিবারের কোনো সম্মতি নেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে অন্ধকারে রেখে এসব মৃতদেহ আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে ইসরায়েলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন
এই পুরো প্রক্রিয়াটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের 'ইনফর্মড কনসেন্ট' বা 'অবহিত সম্মতি'র ধারণাকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি দাতাদের পবিত্র ইচ্ছার অবমাননা। মানুষ যখন গবেষণার জন্য শরীর দান করেন, তখন তাঁরা কখনোই কল্পনা করেন না যে তাঁদের সেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কোনো দেশের সামরিক মহড়া বা যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হবে।
ব্যবসা বনাম মানবিকতা
যুক্তরাষ্ট্রের এই মৃতদেহ ব্যবসার বাজারটি এখনো অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ আইনের অভাবে অনিয়ন্ত্রিত। 'বডি ব্রোকাররা' মৃতদেহগুলোকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়। যেহেতু এটি একটি লাভজনক ব্যবসা, তাই নৈতিকতার চেয়ে মুনাফাই এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের চিকিৎসা প্রশিক্ষণের মান উন্নত করার জন্য এই বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ 'মানব সম্পদ' সংগ্রহ করছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্ত ও জনরোষ
এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকেই এই প্রক্রিয়াকে 'মরদেহের অবমাননা' হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দাবি তুলছেন যে, মৃতদেহ দান এবং তার ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও কঠোর আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটির মূল নির্যাস হলো—গবেষণার নামে সংগৃহীত মৃতদেহ সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের এই ঘটনাটি আধুনিক বিশ্বের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। এটি কেবল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিষয় নয়, বরং কীভাবে মানুষের শেষ ত্যাগকে পণ্যে রূপান্তরিত করা হচ্ছে, তার এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। দাতাদের সম্মান রক্ষা এবং এই ধরণের নিষ্ঠুর বাণিজ্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: আল জাজিরা (দ্য টেক পডকাস্ট)