
ওয়াশিংটনের নীতি ও প্রতিশ্রুতির ওপর তেহরানের বিন্দুমাত্র ভরসা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন প্রশাসন যদি সত্যিই তাদের বৈরী মনোভাব পরিহার করে আলোচনার টেবিলে আন্তরিকতা দেখাতে পারে, তবেই কেবল ইরান দ্বিপাক্ষিক সংলাপে বসতে রাজি হবে। অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করতে পারবে, সে বিষয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। দুবাই-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়ার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (১৫ মে) ভারতের নতুন দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস (BRICS) জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আরাগচি এই কড়া মন্তব্য করেন। তিনি এই সময় বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, যেসব জাহাজ বা দেশ ইরানের সঙ্গে চলমান কোনো সংঘাতে লিপ্ত নয়, তারা এই সমুদ্রপথটি ব্যবহার করতে পারবে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে ইচ্ছুক যেকোনো জাহাজকে অবশ্যই ইরানের নৌবাহিনীর সঙ্গে আগাম সমন্বয় সাধন করে অনুমতি নিতে হবে। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই আন্তর্জাতিক নৌপথটির নিরাপত্তা ও সার্বিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের নেপথ্য ও স্থবির শান্তি আলোচনা
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে মোট উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
গত মাসে বৈশ্বিক চাপের মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে সম্মত হলেও, স্থায়ী কোনো শান্তিচুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষ এখনো কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। এই সংকট নিরসনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে পুরোপুরি থমকে গেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষই একে অপরের দেওয়া শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে আরাগচি বলেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত পরস্পরবিরোধী বার্তা পাঠানো হচ্ছে, যার ফলে তাদের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের মনে গভীর সন্দেহের দানা বাঁধছে। অবশ্য পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা একেবারে ভেস্তে গেছে বলে মানতে নারাজ তিনি; বরং তাঁর মতে, মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াটি এখন একটি চরম জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, কূটনৈতিক উপায়ে সংকটের সমাধানের সুযোগ দিতেই মূলত ইরান এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি যদি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় এবং প্রয়োজন পড়ে, তবে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে লিপ্ত হতে তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার সংলাপ আটকে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকেরা।
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের যৌথ চাপ
এদিকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কঠোর বক্তব্য গণমাধ্যমে আসার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই তেহরানকে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রশাসনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। ট্রাম্প আরও জানান, বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তারা উভয়ই এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্বার্থে ইরানকে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালির অবরুদ্ধ নৌপথটি পুনরায় খুলে দিতে হবে।