
দীর্ঘ ১৪ বছরের খরা কাটিয়ে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের বার্তা নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় পা রাখলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। আজ শনিবার (২৩ মে) সকালে চার ঘণ্টার এক সংক্ষিপ্ত ও ঝটিকা সফরে সস্ত্রীক কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, তিলোত্তমার কয়েকটি বিশেষ স্থান পরিদর্শন শেষেই তিনি বিমানবন্দর হয়ে সরাসরি রাজধানী দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
এই সংক্ষিপ্ত সফরের অংশ হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাদার তেরেসা হাউস এবং বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত ‘ভিক্টোরিয়া চিলড্রেন হোম’ পরিদর্শনে যাবেন।
কলকাতার পর্ব চুকিয়ে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন।
কূটনৈতিক মহলে মার্কো রুবিওর এই আচমকা কলকাতা সফর নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে, কারণ সফরের শুরুতে এখানে তার উপস্থিতি অনেকটাই আকস্মিক ছিল। এর আগে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন বাংলাদেশ সফর শেষে কলকাতায় এসেছিলেন এবং রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন। ফলে দীর্ঘ এক দশক পর কোনো শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিকের এই কলকাতা সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর নতুন কোনো ইঙ্গিত বহন করতে পারে। গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক অলিন্দে গুঞ্জন ছিল যে, রুবিওর এই ভারত সফরে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তার একটি পৃথক বৈঠক হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সফরসূচি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কলকাতায় এমন কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা একেবারেই নেই। অবশ্য দিল্লিতে শুভেন্দু অধিকারী ও মার্কো রুবিও মুখোমুখি হতে পারেন বলে জোর সম্ভাবনা রয়েছে। আর তেমনটি হলে পশ্চিমবঙ্গে নতুন কোনো মার্কিন বিনিয়োগের পথ সুগম হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর রাখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রুবিওর এই গুরুত্বপূর্ণ ভারত সফরের শেষ দিনে, অর্থাৎ আগামী ২৬ মে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘কোয়াড’ (QUAD) গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক মেগা সম্মেলন। এবারের এই হাইভোল্টেজ বৈঠকের স্বাগতিক দেশ ভারত। সম্মেলনে বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া সংকটের জেরে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ ও তার বহুমুখী প্রভাব নিয়ে সদস্য দেশগুলো বিস্তারিত আলোচনা করবে। নয়াদিল্লির এই বৈঠকে মার্কো রুবিও ছাড়াও অংশ নেবেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং এবং জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিতসু। কোয়াডের এই গুরুত্বপূর্ণ আসরে সভাপতিত্ব করবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর।
কলকাতা ও দিল্লির কর্মসূচি শেষ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উত্তর প্রদেশের ঐতিহাসিক আগ্রা এবং রাজস্থানের জয়পুর সফরে যাবেন। সফরকালীন এই সময়ে তিনি ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেবেন।
এর আগে, গত শুক্রবার (২২ মে) সুইডেনে আয়োজিত সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিশেষ বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন মার্কো রুবিও। সেখান থেকেই কোনো বিরতি না নিয়ে সরাসরি ভারতের উদ্দেশ্যে উড়াল দেন তিনি।